তদন্ত কমিশন এ প্রতিবেদনে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো পর্যালোচনা করেছে। এতে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু
গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
তদন্ত কমিশন এ প্রতিবেদনে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো পর্যালোচনা করেছে। এতে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু।
কমিশনের গত সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এসব কর্মকাণ্ডে উসকানি দিয়েছেন। অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে পৃথকভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।
কমিশনের এ প্রতিবেদনকে জেনেভায় ইসরায়েলের মিশন ‘মানহানিকর প্রহসন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। গণহত্যার অভিযোগের বিরুদ্ধে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছে। এ সময় দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ তার মিত্রদের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমর্থনও পেয়েছে।
আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গবেষণা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে কাজ করছে। এ মূল্যায়ন করেছেন জাতিসংঘের তদন্তকারীরা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংস্থা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গণহত্যা বিষয়ক গবেষকরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের পর গণহত্যাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক কনভেনশনে গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে— কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড।
গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতিসংঘের কমিশন বলেছে, যুদ্ধ চলাকালে ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু ও হত্যা করা হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
কমিশনের মতে, গাজায় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার যে গণহত্যামূলক অভিপ্রায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ছিল, তা প্রমাণে বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধার বলেন, ‘প্রমাণ দেখায় যে ফিলিস্তিনি শিশুদের ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং হত্যা করেছে।’
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশু হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও ইসরায়েলি বাহিনী ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ও ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতার অস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এটি ইঙ্গিত করে যে এত বিপুল সংখ্যক শিশুকে হত্যার কারণ এসব হামলা ইচ্ছাকৃত ছিল।’
কমিশনের ধারণা, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী পুরো বেসামরিক জনগোষ্ঠীকেই হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বিবেচনা করায় শিশুদেরও সমষ্টিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
মুরালিধার বলেন, শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গাজার ওপর ইসরায়েলের আরোপিত পরিস্থিতি— যার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক হামলা, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং ত্রাণ, খাদ্য ও ওষুধের অবরোধজনিত অনাহার শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিকাশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ও গভীর মানসিক আঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
তদন্তে আরো ওঠে এসেছে, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রজননসংক্রান্ত স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং গর্ভপাতের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে গাজার প্রায় সব শিশুরই মানসিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটি শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীর নিয়েও আলোকপাত করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইসরায়েলের এ দখলদারিকে অবৈধ ঘোষণা করলেও অঞ্চলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ইসরায়েল।
পশ্চিম তীর, বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে। পাশাপাশি গণগ্রেফতার ও আটক অভিযানের সময় নির্যাতনের প্রমাণও পাওয়া গেছে, যার মধ্যে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আটক অবস্থায় ফিলিস্তিনি শিশুরা—বিশেষত ছেলেরা পদ্ধতিগতভাবে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে জোরপূর্বক পোশাক খুলে ফেলা, মারধর এবং খাদ্য থেকে বঞ্চিত করার মতো ঘটনা রয়েছে।
সবশেষে কমিশন এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, এসব আচরণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এবং তা নির্যাতন ও গুরুতর কষ্ট বা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হওয়া অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের শামিল।


















