ঢাকা ০৬:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আদমজী ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা তিন ‘মাফিয়ার’ কব্জায়: মাসে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) ঝুট ব্যবসা এখন তিন প্রভাবশালী ব্যক্তির কব্জায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি গত ২০ মাসে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এক সময়ের যুবলীগ নেতার নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবসা এখন সাহেদ আহমেদ, রাকিবুর রহমান সাগর এবং শাহআলম মানিক নামের তিন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

আদমজী ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা এক সময় ইন্টারপোলের রেড ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও যুবলীগ নেতা মতিউর রহমান মতির নিয়ন্ত্রণে ছিল। সরকারের পতনের পর সেই দখলদারি হাতবদল হয়ে বর্তমান চক্রটির কাছে চলে আসে। অভিযোগ রয়েছে, শাহআলম মানিক আগে মতির ব্যবসায়িক অংশীদার থাকলেও এখন নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যবসার সুষম বণ্টনের দাবি থাকলেও এই তিন ব্যক্তি তা উপেক্ষা করে একক আধিপত্য কায়েম করেছেন।

৪১টি কারখানার ঝুট নিয়ন্ত্রণ ও বিশাল আয়

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইপিজেডের ভেতরে থাকা ৪১টি কারখানার ঝুট ব্যবসা মূলত এই তিনজনের পকেটে যাচ্ছে। এর মধ্যে:

  • রাকিবুর রহমান সাগর: ১৭টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

  • সাহেদ আহমেদ: ১৫টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

  • শাহআলম মানিক: ৯টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

  • রুহুল আমিন: ৫টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

ব্যবসায়িক সূত্রে জানা গেছে, এই ৪১টি কারখানা থেকে মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা লভ্যাংশ হিসেবে এই চক্রের পকেটে ঢুকছে। অথচ দলের ত্যাগী ও সাধারণ নেতাকর্মীরা এই ব্যবসার সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

এই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে ব্যবসায়িক আধিপত্য বজায় রাখছে। যুবদল নেতা সাহেদ এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাগর দাবি করছেন, তারা ওপর মহলে মোটা অংকের মাসোয়ারা দিয়েই এই ব্যবসা চালাচ্ছেন। এমনকি সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের নির্দেশকেও তারা তোয়াক্কা করছেন না বলে স্থানীয়দের দাবি। অন্যদিকে, সাগর দাবি করেছেন যে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী মহলে মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ১৭টি ফ্যাক্টরির ব্যবসা একচ্ছত্রভাবে ভোগ করছেন।

৫ আগস্টের পর থেকে এই ঝুট ব্যবসার দখল নিয়ে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ১৬ আগস্ট ঝুট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীনের ছেলে কাউসার রিফাতের সাথে সাহেদ আহমেদের বিরোধ তৈরি হয়। এমনকি ১৩টি ট্রাক লুটের অভিযোগও ওঠে সাহেদের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ঝুট সেক্টর দখল নিয়ে সাগর, মানিক ও রুহুল আমিনের গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগে সাগরের এক কর্মীকে পুলিশ ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রুহুল আমিন সিদ্ধিরগঞ্জে একটি দলীয় কার্যালয় স্থাপন করেছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি আসলে তার তেল চুরি ও ঝুট ব্যবসার সুবিধার্থে তৈরি করা একটি আস্তানা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সেখানে বহিরাগত ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনা থাকে বলে জানা গেছে।

ইপিজেডের এই বিশাল বাণিজ্যিক খাতটি এখন গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ায় সাধারণ ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

আদমজী ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা তিন ‘মাফিয়ার’ কব্জায়: মাসে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০২:০৫:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) ঝুট ব্যবসা এখন তিন প্রভাবশালী ব্যক্তির কব্জায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি গত ২০ মাসে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এক সময়ের যুবলীগ নেতার নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবসা এখন সাহেদ আহমেদ, রাকিবুর রহমান সাগর এবং শাহআলম মানিক নামের তিন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

আদমজী ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা এক সময় ইন্টারপোলের রেড ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও যুবলীগ নেতা মতিউর রহমান মতির নিয়ন্ত্রণে ছিল। সরকারের পতনের পর সেই দখলদারি হাতবদল হয়ে বর্তমান চক্রটির কাছে চলে আসে। অভিযোগ রয়েছে, শাহআলম মানিক আগে মতির ব্যবসায়িক অংশীদার থাকলেও এখন নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যবসার সুষম বণ্টনের দাবি থাকলেও এই তিন ব্যক্তি তা উপেক্ষা করে একক আধিপত্য কায়েম করেছেন।

৪১টি কারখানার ঝুট নিয়ন্ত্রণ ও বিশাল আয়

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইপিজেডের ভেতরে থাকা ৪১টি কারখানার ঝুট ব্যবসা মূলত এই তিনজনের পকেটে যাচ্ছে। এর মধ্যে:

  • রাকিবুর রহমান সাগর: ১৭টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

  • সাহেদ আহমেদ: ১৫টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

  • শাহআলম মানিক: ৯টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

  • রুহুল আমিন: ৫টি কারখানার নিয়ন্ত্রণ।

ব্যবসায়িক সূত্রে জানা গেছে, এই ৪১টি কারখানা থেকে মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা লভ্যাংশ হিসেবে এই চক্রের পকেটে ঢুকছে। অথচ দলের ত্যাগী ও সাধারণ নেতাকর্মীরা এই ব্যবসার সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

এই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে ব্যবসায়িক আধিপত্য বজায় রাখছে। যুবদল নেতা সাহেদ এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাগর দাবি করছেন, তারা ওপর মহলে মোটা অংকের মাসোয়ারা দিয়েই এই ব্যবসা চালাচ্ছেন। এমনকি সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের নির্দেশকেও তারা তোয়াক্কা করছেন না বলে স্থানীয়দের দাবি। অন্যদিকে, সাগর দাবি করেছেন যে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী মহলে মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ১৭টি ফ্যাক্টরির ব্যবসা একচ্ছত্রভাবে ভোগ করছেন।

৫ আগস্টের পর থেকে এই ঝুট ব্যবসার দখল নিয়ে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ১৬ আগস্ট ঝুট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীনের ছেলে কাউসার রিফাতের সাথে সাহেদ আহমেদের বিরোধ তৈরি হয়। এমনকি ১৩টি ট্রাক লুটের অভিযোগও ওঠে সাহেদের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ঝুট সেক্টর দখল নিয়ে সাগর, মানিক ও রুহুল আমিনের গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগে সাগরের এক কর্মীকে পুলিশ ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রুহুল আমিন সিদ্ধিরগঞ্জে একটি দলীয় কার্যালয় স্থাপন করেছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি আসলে তার তেল চুরি ও ঝুট ব্যবসার সুবিধার্থে তৈরি করা একটি আস্তানা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সেখানে বহিরাগত ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনা থাকে বলে জানা গেছে।

ইপিজেডের এই বিশাল বাণিজ্যিক খাতটি এখন গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ায় সাধারণ ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।