ঢাকা ০৪:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলকে পিতৃভূমি ও আমিরাতকে দ্বিতীয় বাড়ি বললেন নরেন্দ্র মোদি

ইসরায়েলকে পিতৃভূমি ও আমিরাতকে দ্বিতীয় বাড়ি বললেন নরেন্দ্র মোদি

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের ভারসাম্য ধরে রাখতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একদিকে ইসরায়েলকে ‘পিতৃভূমি’ এবং অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) নিজের ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

শুক্রবার (১৫ মে) পাঁচ দেশীয় সফরের প্রথম ধাপে আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে মোদিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।

বিমানবন্দর থেকেই দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রতিনিধিদল পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শুরু হয়, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থান পায়। এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল সফরে গিয়ে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে বক্তব্য রাখার সময় তিনি ইসরায়েলকে পিতৃভূমি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠককালে নরেন্দ্র মোদি গভীর আবেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আমার দ্বিতীয় বাড়িতে এসেছি। এই অনুভূতিটি আমার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, আগামী দিনগুলোতে ভারত ও আমিরাত প্রতিটি ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করবে এবং যেকোনো সংকটে আমিরাতের পাশে দাঁড়াতে ভারত বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

দুই দেশের এই অভূতপূর্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থে নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান তীব্র যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মোদি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন আর কোনো আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।

এমন একটি জটিল ও সংবেদনশীল সময়ে সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করতে হবে বলে মোদি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের স্থায়ী এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মোদির এই সফরটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি বড় কূটনৈতিক প্রয়াস।

বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চলমান বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সংকটের মধ্যে কীভাবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখা যায়, তা নিয়ে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে মোদি তার এই সফরের অভিজ্ঞতাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন।

অন্যদিকে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল সফরে গিয়ে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ‘ইসরায়েল আমাদের পিতৃভূমি, ভারত আমাদের মাতৃভূমি।’ তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারত এমন একটি দেশ যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা, কৃষি, সাইবার প্রযুক্তি, জলব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গত এক দশকে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার প্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই পিতৃভূমি সংক্রান্ত মন্তব্যের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় প্রসঙ্গে এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা থাকা জরুরি। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা পাল্টা দাবি করেছেন, বক্তব্যটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছে এবং তা নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি আরব দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল মোদির এই দুই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।

ইসরায়েলকে পিতৃভূমি ও আমিরাতকে দ্বিতীয় বাড়ি বললেন নরেন্দ্র মোদি

আপডেট সময় : ০১:২২:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের ভারসাম্য ধরে রাখতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একদিকে ইসরায়েলকে ‘পিতৃভূমি’ এবং অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) নিজের ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

শুক্রবার (১৫ মে) পাঁচ দেশীয় সফরের প্রথম ধাপে আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে মোদিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।

বিমানবন্দর থেকেই দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রতিনিধিদল পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শুরু হয়, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থান পায়। এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল সফরে গিয়ে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে বক্তব্য রাখার সময় তিনি ইসরায়েলকে পিতৃভূমি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠককালে নরেন্দ্র মোদি গভীর আবেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আমার দ্বিতীয় বাড়িতে এসেছি। এই অনুভূতিটি আমার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, আগামী দিনগুলোতে ভারত ও আমিরাত প্রতিটি ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করবে এবং যেকোনো সংকটে আমিরাতের পাশে দাঁড়াতে ভারত বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

দুই দেশের এই অভূতপূর্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থে নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান তীব্র যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মোদি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন আর কোনো আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।

এমন একটি জটিল ও সংবেদনশীল সময়ে সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করতে হবে বলে মোদি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের স্থায়ী এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মোদির এই সফরটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি বড় কূটনৈতিক প্রয়াস।

বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চলমান বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সংকটের মধ্যে কীভাবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখা যায়, তা নিয়ে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে মোদি তার এই সফরের অভিজ্ঞতাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন।

অন্যদিকে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল সফরে গিয়ে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ‘ইসরায়েল আমাদের পিতৃভূমি, ভারত আমাদের মাতৃভূমি।’ তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারত এমন একটি দেশ যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা, কৃষি, সাইবার প্রযুক্তি, জলব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গত এক দশকে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার প্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই পিতৃভূমি সংক্রান্ত মন্তব্যের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় প্রসঙ্গে এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা থাকা জরুরি। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা পাল্টা দাবি করেছেন, বক্তব্যটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছে এবং তা নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি আরব দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল মোদির এই দুই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।