ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। এমন এক সময়ে এই সফর হচ্ছে, যখন একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ নতুন কৌশল খুঁজছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আগামী ২১ ও ২২ জুন অনুষ্ঠিতব্য এই সফরে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ আরও সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি, অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সংস্কার এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য বৈষম্য কমানো, বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, হালাল শিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বাস্তবায়নের পথ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদন খাতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলোও আলোচ্যসূচিতে স্থান পেতে পারে।
কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর এশিয়া অঞ্চলে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের বেইজিং সফরের আহ্বান এবং একই সময়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণ, সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফর কোথায় হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে ছিল ব্যাপক আলোচনা। শেষ পর্যন্ত ভারত কিংবা
চীন নয়, বরং তৃতীয় একটি বন্ধুরাষ্ট্রকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের সরকার এক ধরনের ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শ্রমবাজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু : সফরের অন্যতম প্রধান
আলোচ্য বিষয় হতে পারে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় আট লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এটি বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বৃহৎ গন্তব্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি, দক্ষ কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, নিয়োগ ব্যয় কমানো এবং কর্মীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক ও জটিলতা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ চাইছে আরও স্বচ্ছ ও টেকসই কাঠামোর মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে। একই সঙ্গে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে দেশটির বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
বাণিজ্য বৈষম্য কমানোর চেষ্টা
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ২৮০ কোটি মার্কিন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ২৫ থেকে ৩০ কোটি ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বাণিজ্য ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে মালয়েশিয়ার পক্ষে। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে এই বৈষম্য কমানোর বিষয়টি সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, কৃষিজাত প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, সিরামিক এবং বিভিন্ন ভোক্তাপণ্য মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে পাম তেল, ইলেকট্রনিক পণ্য, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও বিভিন্ন কাঁচামাল। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো গেলে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
হালাল শিল্পে বড় সম্ভাবনা
মালয়েশিয়ার বিশাল হালাল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। দেশটির হালাল খাদ্যপণ্যের বাজারের আকার প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সূত্রগুলো জানিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সীমিত পরিসরে হালাল খাদ্যপণ্য রপ্তানি হলেও সম্ভাবনার তুলনায় তা খুবই কম। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করেন, শুল্ক সুবিধা এবং মান সনদ প্রক্রিয়া সহজ হলে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের উপস্থিতি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পানীয়, মসলা, বিস্কুট, নুডলস, হিমায়িত খাদ্য এবং কৃষিভিত্তিক পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এফটিএ আলোচনায় গতি আনার চেষ্টা
প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখওও তা আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে এফটিএ নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ের নতুন গতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হতে পারে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভারত, পাকিস্তানসহ একাধিক দেশের মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। ফলে ওই দেশগুলোর পণ্য মালয়েশিয়ার বাজারে তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এফটিএ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে জোর
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ আকর্ষণ। বাংলাদেশের অবকাঠামো, উৎপাদনশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং উৎপাদন সক্ষমতা মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অবস্থান দ্বিতীয়। সূত্রগুলো জানিয়েছে, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি সফরের আলোচনায় থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের অর্থনীতিতে দক্ষ মানবসম্পদই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ। ফলে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানো বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অংশ হতে পারে।
মালয়েশয়িা প্রবাসীদের মধ্যে উদ্দীপনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে এরই মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্য রাজধানী কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশি অধ্যুষিত রাস্তাগুলো আলপনা আঁকা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের মালয়েশিয়া সফর হওয়ায় প্রবাসীরা এটিকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আশা করছেন, এই সফরে শ্রমবাজার, কলিং ভিসা, অবৈধ কর্মীদের বৈধতা এবং প্রবাসীদের কল্যাণ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন। মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো সিন্ডিকেটমুক্ত কলিং ভিসা চালু করা।
কুয়ালালামপুরে কর্মরত এবং জাসাস সভাপতি শেখ আসাদুজ্জমান মাসুম বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দেশ শাসনের দায়িত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে তিনি মালয়েশিয়া আসছেন। প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করছে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করছেন। অনেকেই কর্মসংস্থান সংকটের কারণে অনিয়মিত অবস্থায় চলে গেছেন। সেলাঙ্গরে বসবাসরত এক প্রবাসী শ্রমিক বলেন, আমরা অনেকেই বছরের পর বছর এখানে কাজ করছি। সুযোগ পেলে বৈধ হওয়ার মাধ্যমে দেশের জন্য আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারব। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে আলোচনা হলে হাজারো পরিবার উপকৃত হবে।























