মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি আরো উসকে ওঠার পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির এক গবেষণায় বলা হয়, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে চলতি বছরে ১০ শতাংশ ছাড়াতে পারে মূল্যস্ফীতি।
বিপরীতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ক্ষয় হতে পারে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার। আর যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
‘২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরান যুদ্ধ): বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব’ শীর্ষক এক নিবন্ধে এসব পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্টস ইউনিটের পরিচালক ড. মো. সেলিম আল মামুনের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল নিবন্ধটি তৈরি করেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা এ নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ডলারের বিনিময় হারের সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে, একই সঙ্গে যখন বিনিময় হার অবমূল্যায়নও হয়, তখন মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য অভিঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিবন্ধে তিনটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো ডলারের দর ধরে না রেখে এক্ষেত্রে নমনীয় ভূমিকা রাখা, দেশে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা সমন্বয় করা এবং বিদ্যমান সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক গবেষণায়ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের অভিঘাত আসতে পারে, সেটির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রফতানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি হ্রাস পেতে পারে ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
এতে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্রভাবে বাড়বে বলে মনে করছে সানেম। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। বিপরীতে প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে, যা মূলত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এ ধাক্কার অসম প্রভাব বিভিন্ন খাতের পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট, যেখানে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ, পরিবহন খাতে প্রায় ৩ শতাংশ এবং কৃষি উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি-নিবিড় উৎপাদন খাতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পতন হতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারের প্রতি সাতটি সুপারিশ করেছে গবেষণা সংস্থাটি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাত এরই মধ্যে অর্থনীতির নানা খাতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন ব্যাংক নির্বাহীরাও। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশের বাজারে জেট ফুয়েল ও এলপিজি ছাড়া অন্য কোনো জ্বালানি পণ্যের দাম এখনো বাড়ানো হয়নি। অথচ এরই মধ্যে সব ধরনের পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের সংকটকে অজুহাত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা এলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটি অনুমান করাও কঠিন।’
দেশের ব্যাংক খাতে গত এক মাসে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১ টাকা বেড়েছে বলে জানান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে এখনো ডলারের বাজার শান্ত আছে। রফতানি আয় যেভাবে কমে যাচ্ছে, তাতে বেশিদিন বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকবে না। বিপরীতে জ্বালানি পণ্যসহ অন্যান্য আমদানির ব্যয় বাড়ছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের ব্যাংক খাত নানা ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্রুত না থামলে এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে।’
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাত মূল্যায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত গবেষণায় স্ট্রাকচারাল ভেক্টর অটোরিগ্রেশন (এসবিএআর) মডেল ব্যবহার করা হয়। এর আওতায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম, বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনটি পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে—জ্বালানি তেলের মূল্য ধাক্কা, বিনিময় হার অবমূল্যায়নজনিত ধাক্কা এবং তেলের দাম ও বিনিময় হারের সম্মিলিত ধাক্কা। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় হলে এবং একই সঙ্গে বিনিময় হার বেড়ে গেলে চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়বে। এক্ষেত্রে আগামী ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমতে পারে। সেক্ষেত্রে গ্রস রিজার্ভ নেমে আসতে পারে ২৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গ্রস রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। আর মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ঘরে রয়েছে।
গবেষণার নীতিগত প্রভাব তুলে ধরে এতে বলা হয়, বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বাংলাদেশী অর্থনীতি বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মূল্য ধাক্কা এবং বিনিময় হার অবমূল্যায়নের সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বৈশ্বিক তেলের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে, বিশেষ করে যখন তা বিনিময় হার অবমূল্যায়নের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন মূল্যস্ফীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে নীতি প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যায়। সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে ডলারের বিনিময় হার নমনীয় করা যেতে পারে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামঞ্জস্য রাখতে জ্বালানি তেলের মূল্য আংশিকভাবে সমন্বয় করার দরকার হতে পারে। এতে বিদ্যমান সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বজায় রাখারও সুপারিশ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত এক গবেষক বলেন, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি তেল, বিনিময় হারসহ অর্থনীতিতে যেসব অভিঘাত আসতে পারে—সেগুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। আর গবেষণা ও বিশ্লেষণের যে ফলাফল এসেছে, সেটির ভিত্তিতে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা দরকার, তার সুপারিশ করেছি। আশা করছি, নীতিনির্ধারকরা সুপারিশগুলো আমলে নেবেন। একই সঙ্গে অর্থনীতি ও জনগণকে সুরক্ষা দিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’



























