ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে দৈনিক ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার চাকা স্থবির হয়ে পড়ছে। বিজিএমইএ-র তথ্যমতে, এই পরিস্থিতির কারণে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এতে সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে জ্বালানি খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। বিজিএমইএ-র সহসভাপতি ইনামুল হক খান জানান, স্বাভাবিক সময়ে ১০ ঘণ্টা কাজ হলেও এখন ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে লোকসান দিয়ে হলেও উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছে, কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা এই বাড়তি দাম দিতে রাজি নন।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ছোট ও মাঝারি মানের কারখানাগুলোর ওপর। উৎপাদন খরচ সামলাতে না পেরে ইতিমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বেশ কিছু বন্ধ হওয়ার উপক্রমে রয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ফুয়েল পাস দিয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বড় কারখানাগুলো কোনোমতে টিকে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত মার্চে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৮১ কোটি মার্কিন ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেও সামগ্রিক রপ্তানি আয় প্রায় ৫.৫১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি আয়ের এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তুলার দাম প্রতি কেজিতে প্রায় ৬০ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পেট্রোলিয়াম বাইপ্রোডাক্টস যেমন পলিস্টার ও নাইলনের দামও হু-হু করে বাড়ছে। অন্যদিকে শিপমেন্টে বিলম্ব হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। ক্ষেত্রবিশেষে দ্রুত সরবরাহের জন্য কার্গো বিমানে পণ্য পাঠাতে বলা হলেও তার অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে দেশি ব্যবসায়ীদের।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা আবাসিক মিশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, জ্বালানি আমদানিতে একটি মাত্র পথের ওপর নির্ভরশীল থাকা আমাদের বড় দুর্বলতা। তিনি বলেন:
“জ্বালানিতে দীর্ঘ সময় ভর্তুকি না দিয়ে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করা উচিত ছিল। এতে মানুষ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতো। এখন গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও বিকল্প উৎস খোঁজা জরুরি।”
এদিকে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলেও উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ সতর্ক করে বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবরের কারণে অনেক বিদেশি ক্রেতা এখন বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এই পরিস্থিতি উত্তরণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পোশাক খাত বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়তে পারে।




















