ঢাকা ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইবোলার টিকা আসতে লাগতে পারে আরও ৯ মাস

ইবোলার টিকা আসতে লাগতে পারে আরও ৯ মাস

প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রতিষেধক বাজারে আসতে আরও প্রায় ৯ মাস সময় লেগে যেতে পারে। জাতিসংঘের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বর্তমানে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (ডিআর) কঙ্গোতে এই রোগটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে।

ড. ভাসি মূর্তি জানান, ইবোলা ভাইরাসের ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির বিস্তার ঠেকাতে বর্তমানে দুটি সম্ভাব্য ‘ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন’ তৈরির কাজ চলছে। তবে প্রতিষেধক দুটি এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ধাপে পৌঁছায়নি। টিকা দুটির উৎপাদন সম্পন্ন করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করতে আনুমানিক ৯ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে।

কঙ্গোতে ইবোলার প্রকোপ বর্তমানে প্রায় মহামারি পর্যায়ে রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ইবোলার উপসর্গ নিয়ে ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও প্রায় ৬০০ জনের শরীরে এই রোগের লক্ষণ পাওয়া গেছে।

সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি এবং উত্তর কিভু প্রদেশের ৫১ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে ইবোলার উপস্থিতি মিলেছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ উগান্ডার রাজধানী কাম্পালাতেও ২ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

কঙ্গোতে ইবোলার এই ভয়াবহ বিস্তারের কারণে গত ১৭ মে বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে ডব্লিউএইচও। তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে যে, পরিস্থিতি জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রার মহামারি হলেও এটি এখনো বৈশ্বিক মহামারির রূপ নেয়নি।

এদিকে কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে ইবোলা মোকাবিলায় ২ কোটি পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা) অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এই অর্থ মূলত ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাতা, রোগ নজরদারি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঙ্গোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৪৬ জন ইবোলা আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত রোগীর মধ্যে ৬ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক। আক্রান্ত এই নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিজ্ঞানীদের মতে, ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’। এর মোট ছয়টি প্রজাতি (জাইর, সুদান, বুন্ডিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট ও বোম্বালি) রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ‘জাইর’ প্রজাতির কারণে বেশি সংক্রমণ হলেও, কঙ্গো ও উগান্ডার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতিটি দায়ী।

ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয়। এটি মূলত মানুষ এবং প্রাইমেট গোত্রীয় প্রাণী (যেমন: শিম্পাঞ্জি, গরিলা, ওরাংওটাং) থেকে ছড়ায়। আক্রান্তের রক্ত, লালা, ঘাম, মল-মূত্র বা অন্য কোনো তরল পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। এছাড়া ফলখেকো বাদুড়কে এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক ধরা হয়, তবে তারা নিজেরা এতে আক্রান্ত হয় না। বনমানুষ, হরিণ ও সজারুর মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।

এই রোগে আক্রান্ত হলে প্রাথমিকভাবে তীব্র জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও মাংসপেশিতে ব্যথা দেখা দেয়। পরবর্তী ধাপে বমি, ডায়রিয়া, ফুসকুড়ি এবং লিভার-কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে চোখ, নাক, মুখ বা মলদ্বার দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ কারণে একে ‘হেমারোজিক ফিভার’ বা রক্তক্ষরণ জ্বরও বলা হয়।

কম সংক্রামক হওয়া সত্ত্বেও ইবোলায় মৃত্যুর হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। গড়ে এই রোগে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ হলেও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী কঙ্গোর সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে এই হার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজীপুরে পোশাক কারখানায় পানি পান করে শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ

ইবোলার টিকা আসতে লাগতে পারে আরও ৯ মাস

আপডেট সময় : ১০:৩০:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রতিষেধক বাজারে আসতে আরও প্রায় ৯ মাস সময় লেগে যেতে পারে। জাতিসংঘের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বর্তমানে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (ডিআর) কঙ্গোতে এই রোগটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে।

ড. ভাসি মূর্তি জানান, ইবোলা ভাইরাসের ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির বিস্তার ঠেকাতে বর্তমানে দুটি সম্ভাব্য ‘ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন’ তৈরির কাজ চলছে। তবে প্রতিষেধক দুটি এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ধাপে পৌঁছায়নি। টিকা দুটির উৎপাদন সম্পন্ন করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করতে আনুমানিক ৯ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে।

কঙ্গোতে ইবোলার প্রকোপ বর্তমানে প্রায় মহামারি পর্যায়ে রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ইবোলার উপসর্গ নিয়ে ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও প্রায় ৬০০ জনের শরীরে এই রোগের লক্ষণ পাওয়া গেছে।

সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি এবং উত্তর কিভু প্রদেশের ৫১ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে ইবোলার উপস্থিতি মিলেছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ উগান্ডার রাজধানী কাম্পালাতেও ২ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

কঙ্গোতে ইবোলার এই ভয়াবহ বিস্তারের কারণে গত ১৭ মে বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে ডব্লিউএইচও। তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে যে, পরিস্থিতি জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রার মহামারি হলেও এটি এখনো বৈশ্বিক মহামারির রূপ নেয়নি।

এদিকে কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে ইবোলা মোকাবিলায় ২ কোটি পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা) অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এই অর্থ মূলত ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাতা, রোগ নজরদারি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঙ্গোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৪৬ জন ইবোলা আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত রোগীর মধ্যে ৬ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক। আক্রান্ত এই নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিজ্ঞানীদের মতে, ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’। এর মোট ছয়টি প্রজাতি (জাইর, সুদান, বুন্ডিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট ও বোম্বালি) রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ‘জাইর’ প্রজাতির কারণে বেশি সংক্রমণ হলেও, কঙ্গো ও উগান্ডার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতিটি দায়ী।

ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয়। এটি মূলত মানুষ এবং প্রাইমেট গোত্রীয় প্রাণী (যেমন: শিম্পাঞ্জি, গরিলা, ওরাংওটাং) থেকে ছড়ায়। আক্রান্তের রক্ত, লালা, ঘাম, মল-মূত্র বা অন্য কোনো তরল পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। এছাড়া ফলখেকো বাদুড়কে এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক ধরা হয়, তবে তারা নিজেরা এতে আক্রান্ত হয় না। বনমানুষ, হরিণ ও সজারুর মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।

এই রোগে আক্রান্ত হলে প্রাথমিকভাবে তীব্র জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও মাংসপেশিতে ব্যথা দেখা দেয়। পরবর্তী ধাপে বমি, ডায়রিয়া, ফুসকুড়ি এবং লিভার-কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে চোখ, নাক, মুখ বা মলদ্বার দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ কারণে একে ‘হেমারোজিক ফিভার’ বা রক্তক্ষরণ জ্বরও বলা হয়।

কম সংক্রামক হওয়া সত্ত্বেও ইবোলায় মৃত্যুর হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। গড়ে এই রোগে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ হলেও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী কঙ্গোর সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে এই হার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে।