ঢাকা ১২:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামিসা হত্যা আদালতে আনা হলো সোহেল-স্বপ্নাকে, রায়ের অপেক্ষা

রামিসা হত্যা আদালতে আনা হলো সোহেল-স্বপ্নাকে, রায়ের অপেক্ষা

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়েছে।

আজ রোববার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে আসামি সোহেল রানাকে ঢাকা মহানগর আদালত প্রাঙ্গণে আনে পুলিশ। পরে তাকে হাজতখানায় নেওয়া হয়।

এর আগে এদিন সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে একই মামলার অপর আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার আগে দুজনই হাজতখানায় রয়েছেন।

জানা গেছে, আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত।

এদিন রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও তৎপর থাকতে দেখা গেছে আদালত প্রাঙ্গণে।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন আদালত। মাত্র ৪ কার্যদিবসে মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়।

যুক্তিতর্ক শুনানিতে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু আসামিরা কীভাবে অভিযুক্ত, সাক্ষিরা আসামিদের সমন্ধে কী বলেছে এবং আইনের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও রেফারেন্স তুলে ধরেন। সর্বশেষ, সাক্ষিরা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে মর্মে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করেন।

আর যুক্তিতর্ক শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। যেই ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেটা ফরেনসিক করেননি। এটার ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া যেতে পারে না। নিজেকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন৷ এই বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে তার যাবজ্জীবন সাজা প্রার্থনা করছি। স্বপ্না আক্তারের ১৬ জন সাক্ষী লাশ গুমের অভিযোগ ছাড়া কিছুই নেই। তাকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাজা দেওয়া হোক। ওইদিন যুক্তিতর্ক শুনানির পর বিচারক ৭ জুন রায় ঘোষণার দিন ঠিক করেন।

এর আগে গত ২ জুন এই মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহন করেন আদালত। সাক্ষিরা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ভিডিও প্রমাণ ও বিভিন্ন আলামত সম্পর্কে আসামিদের সামনে তুলে ধরেন। এতে রামিসাকে খোঁজার ঘটনা, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট শনাক্ত করা, রক্তের আলামত উদ্ধার এবং শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে অভিযোগ অনুযায়ী স্বপ্না আক্তার কীভাবে সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন, সে বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।

এরপর আসামি সোহেলের কিছু বলার আছে কি না, জানতে চাইলে সোহেল আদালতকে বলেন, আমি ক্ষমা চাচ্ছি স্যার আমাকে মাফ করে দেন। আরেকটা কথা আমার বউ কোনো দোষ করেনি, সে নির্দোষ। এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে বলেন আপনারটা আপনি বলেন।

এরপর স্বপ্নার বক্তব্য শুনতে চান আদালত। প্রথমে নিশ্চুপ থাকলে আদালত তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দরজা কেন খুলেননি এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে চান কি না।

এ সময় তাকে সতর্ক করে আদালত বলেন, আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে শাস্তি তার হবে একই শাস্তি আপনারও হবে। এরপর স্বপ্না বলেন, আমি কিছু করিনি স্যার। আমি নির্দোষ।

উল্লেখ্য, এ মামলায় গত ২ জুন চার্জশিটভুক্ত ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেন আদালত।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যান।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে ৪ কার্যদিবসে মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

রামিসা হত্যা আদালতে আনা হলো সোহেল-স্বপ্নাকে, রায়ের অপেক্ষা

আপডেট সময় : ১০:৪৫:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়েছে।

আজ রোববার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে আসামি সোহেল রানাকে ঢাকা মহানগর আদালত প্রাঙ্গণে আনে পুলিশ। পরে তাকে হাজতখানায় নেওয়া হয়।

এর আগে এদিন সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে একই মামলার অপর আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার আগে দুজনই হাজতখানায় রয়েছেন।

জানা গেছে, আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত।

এদিন রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও তৎপর থাকতে দেখা গেছে আদালত প্রাঙ্গণে।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন আদালত। মাত্র ৪ কার্যদিবসে মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়।

যুক্তিতর্ক শুনানিতে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু আসামিরা কীভাবে অভিযুক্ত, সাক্ষিরা আসামিদের সমন্ধে কী বলেছে এবং আইনের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও রেফারেন্স তুলে ধরেন। সর্বশেষ, সাক্ষিরা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে মর্মে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করেন।

আর যুক্তিতর্ক শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। যেই ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেটা ফরেনসিক করেননি। এটার ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া যেতে পারে না। নিজেকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন৷ এই বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে তার যাবজ্জীবন সাজা প্রার্থনা করছি। স্বপ্না আক্তারের ১৬ জন সাক্ষী লাশ গুমের অভিযোগ ছাড়া কিছুই নেই। তাকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাজা দেওয়া হোক। ওইদিন যুক্তিতর্ক শুনানির পর বিচারক ৭ জুন রায় ঘোষণার দিন ঠিক করেন।

এর আগে গত ২ জুন এই মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহন করেন আদালত। সাক্ষিরা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ভিডিও প্রমাণ ও বিভিন্ন আলামত সম্পর্কে আসামিদের সামনে তুলে ধরেন। এতে রামিসাকে খোঁজার ঘটনা, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট শনাক্ত করা, রক্তের আলামত উদ্ধার এবং শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে অভিযোগ অনুযায়ী স্বপ্না আক্তার কীভাবে সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন, সে বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।

এরপর আসামি সোহেলের কিছু বলার আছে কি না, জানতে চাইলে সোহেল আদালতকে বলেন, আমি ক্ষমা চাচ্ছি স্যার আমাকে মাফ করে দেন। আরেকটা কথা আমার বউ কোনো দোষ করেনি, সে নির্দোষ। এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে বলেন আপনারটা আপনি বলেন।

এরপর স্বপ্নার বক্তব্য শুনতে চান আদালত। প্রথমে নিশ্চুপ থাকলে আদালত তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দরজা কেন খুলেননি এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে চান কি না।

এ সময় তাকে সতর্ক করে আদালত বলেন, আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে শাস্তি তার হবে একই শাস্তি আপনারও হবে। এরপর স্বপ্না বলেন, আমি কিছু করিনি স্যার। আমি নির্দোষ।

উল্লেখ্য, এ মামলায় গত ২ জুন চার্জশিটভুক্ত ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেন আদালত।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যান।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে ৪ কার্যদিবসে মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়।