ঢাকা ০৩:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্তানদের প্রেম নিয়ে দ্বন্দ্ব, পথে দেয়াল তুলে ২৫ পরিবারের চলাচলে বাধা

জামালপুরে কিশোর-কিশোরীর প্রেম নিয়ে দুই পরিবারে বিরোধের জেরে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেয়াল নির্মাণের ঘটনা ঘটেছে। এতে ২২ দিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছে ওই এলাকার ২৫টি পরিবারের প্রায় ২৫০ জন মানুষ।

চলাচলের একমাত্র রাস্তায় দেয়াল নির্মাণ করায় নামাজের জন্য মসজিদেও যেতে পারছেন না তারা। এদিকে প্রশাসনের দারস্থ হয়েও কোনো সমাধান পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তবে প্রশাসন বলছে, বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, জামালপুর পৌর এলাকার বেলটিয়া খুপিবাড়ী পলিসা গ্রামের মোকাদ্দেস হোসেনের ১৫ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ের সঙ্গে একই এলাকার কবির হোসেনের ১৬ বছর বয়সী ছেলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মোকাদ্দেস হোসেনের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায় কবির হোসেনের ছেলে। মেয়েকে না পেয়ে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ওই মেয়ের মা শারমিন আক্তার ছেলেসহ তার বাবা-মাকে আসামি করে জামালপুর সদর থানায় অপহরণ মামলা করেন। পরে পুলিশ ওই কিশোর-কিশোরীকে উদ্ধার করে আদালতে সোপর্দ করেন। আদালত মেয়ের জবানবন্দি শেষে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয় এবং ছেলের বাবা মাকে কারাগারে প্রেরণ করে। পরে ছেলের বাবা-মা তিনমাস জেলে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনায় ক্ষোভে ছেলের বাবা কবির হোসেন জেলে থেকে মুক্তি পেয়েই চলতি বছরের ২৪ মার্চ বাড়ির সামনে চলাচলের রাস্তায় দেয়াল তৈরি করে রাস্তা বন্ধ করে দেন। কবির হোসেন দাবি করেন রাস্তাটি তার ব্যক্তিগত জমি। তাই তাদের বাড়ির জায়গা কম থাকায় রাস্তায় দেয়াল তুলেছেন।

এদিকে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো চলাচলের রাস্তায় দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ২৫টি পরিবারের প্রায় ২৫০ জন মানুষ। স্কুলেও যেতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। কেউ অসুস্থ হলেও সহজে হাসপাতালে নিতে পারছে না তারা। এছাড়া ভোগান্তিতে পড়েছেন মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা। এ ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিক বার সালিস বৈঠক করা হলেও কোনো সমাধান পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। প্রতিকার চেয়ে জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন আখতারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও এখনো সমাধান পায়নি তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী নারী বলেন, রাস্তাটি বন্ধ করায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। বাচ্চা নিয়ে স্কুলে যেতে পারছি না, ডাক্তার এর কাছে যেতে পাচ্ছি না। ছেলে মানুষরা তাও দেয়ালের ওপর দিয়ে যেতে পারে কিন্তু আমরা মহিলারা তো সেটাও পারি না। এই রাস্তার সূত্র ধরে একটা মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। সেই মসজিদে কোনো মুসল্লি নামাজ পড়তে যেতে পারছে না। ওদের মধ্যে একটা মামলা চলছে। আমরা তো কারো নামে মামলা করিনি। আমাদের রাস্তা কেন বন্ধ করা হলো? আমরা গৃহবন্দি হয়ে আছি। আমরা এটার জন্য সঠিক বিচার চাই।

ছেলের মা বলেন, আমার ছেলের সাথে মোকাদ্দেসের মেয়ের প্রেম ছিল এবং তারা পালিয়ে গিয়েছিল। আমি আর আমার স্বামী কি দোষ করেছিলাম? আমাদের কেন জেল খাটালো? এটা আমাদের রাস্তা আমি ওদের এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে দেব না।

ছেলের বাবা কবির হোসেন (৫৬) বলেন, এখানে আমার ২২ শতাংশ জমি আছে। এই জমি আমি এখনো বুঝে পাইনি। অনেক বার মোকাদ্দেসকে আমার ২২ শতাংশ জমি বুঝিয়ে দিতে বলেছি। কিন্তু সে দেয়নি, তাই আমি বাধ্য হয়ে দেয়াল তুলেছি। আমাকে জমি বুঝিয়ে দিলে আমি দেয়াল তুলে নেব।

তবে এই বিষয়ে মেয়ের বাবা মোকাদ্দেস হোসেন ও তার পরিবারে অন্য সদস্যদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।

জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার ঢাকা পোস্টকে বলেন, জামালপুর পৌরসভার বেলটিয়া এলাকায় এক ব্যক্তির রাস্তা অবরোধ করার ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরাও আমাদেরকে অভিযোগ করেছেন। এই বিষয়ে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সে এর মধ্যে শুনানিও নিয়েছে এবং আমাদের যে সংশ্লিষ্ট উপ সহকারী (ভূমি) কর্মকর্তা তিনিও ঘটনাস্থলে গিয়েছেন এবং তদন্ত করেছেন। এটি আইনগত ভাবে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সন্তানদের প্রেম নিয়ে দ্বন্দ্ব, পথে দেয়াল তুলে ২৫ পরিবারের চলাচলে বাধা

আপডেট সময় : ০২:১৪:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

জামালপুরে কিশোর-কিশোরীর প্রেম নিয়ে দুই পরিবারে বিরোধের জেরে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেয়াল নির্মাণের ঘটনা ঘটেছে। এতে ২২ দিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছে ওই এলাকার ২৫টি পরিবারের প্রায় ২৫০ জন মানুষ।

চলাচলের একমাত্র রাস্তায় দেয়াল নির্মাণ করায় নামাজের জন্য মসজিদেও যেতে পারছেন না তারা। এদিকে প্রশাসনের দারস্থ হয়েও কোনো সমাধান পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তবে প্রশাসন বলছে, বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, জামালপুর পৌর এলাকার বেলটিয়া খুপিবাড়ী পলিসা গ্রামের মোকাদ্দেস হোসেনের ১৫ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ের সঙ্গে একই এলাকার কবির হোসেনের ১৬ বছর বয়সী ছেলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মোকাদ্দেস হোসেনের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায় কবির হোসেনের ছেলে। মেয়েকে না পেয়ে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ওই মেয়ের মা শারমিন আক্তার ছেলেসহ তার বাবা-মাকে আসামি করে জামালপুর সদর থানায় অপহরণ মামলা করেন। পরে পুলিশ ওই কিশোর-কিশোরীকে উদ্ধার করে আদালতে সোপর্দ করেন। আদালত মেয়ের জবানবন্দি শেষে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয় এবং ছেলের বাবা মাকে কারাগারে প্রেরণ করে। পরে ছেলের বাবা-মা তিনমাস জেলে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনায় ক্ষোভে ছেলের বাবা কবির হোসেন জেলে থেকে মুক্তি পেয়েই চলতি বছরের ২৪ মার্চ বাড়ির সামনে চলাচলের রাস্তায় দেয়াল তৈরি করে রাস্তা বন্ধ করে দেন। কবির হোসেন দাবি করেন রাস্তাটি তার ব্যক্তিগত জমি। তাই তাদের বাড়ির জায়গা কম থাকায় রাস্তায় দেয়াল তুলেছেন।

এদিকে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো চলাচলের রাস্তায় দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ২৫টি পরিবারের প্রায় ২৫০ জন মানুষ। স্কুলেও যেতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। কেউ অসুস্থ হলেও সহজে হাসপাতালে নিতে পারছে না তারা। এছাড়া ভোগান্তিতে পড়েছেন মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা। এ ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিক বার সালিস বৈঠক করা হলেও কোনো সমাধান পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। প্রতিকার চেয়ে জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন আখতারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও এখনো সমাধান পায়নি তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী নারী বলেন, রাস্তাটি বন্ধ করায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। বাচ্চা নিয়ে স্কুলে যেতে পারছি না, ডাক্তার এর কাছে যেতে পাচ্ছি না। ছেলে মানুষরা তাও দেয়ালের ওপর দিয়ে যেতে পারে কিন্তু আমরা মহিলারা তো সেটাও পারি না। এই রাস্তার সূত্র ধরে একটা মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। সেই মসজিদে কোনো মুসল্লি নামাজ পড়তে যেতে পারছে না। ওদের মধ্যে একটা মামলা চলছে। আমরা তো কারো নামে মামলা করিনি। আমাদের রাস্তা কেন বন্ধ করা হলো? আমরা গৃহবন্দি হয়ে আছি। আমরা এটার জন্য সঠিক বিচার চাই।

ছেলের মা বলেন, আমার ছেলের সাথে মোকাদ্দেসের মেয়ের প্রেম ছিল এবং তারা পালিয়ে গিয়েছিল। আমি আর আমার স্বামী কি দোষ করেছিলাম? আমাদের কেন জেল খাটালো? এটা আমাদের রাস্তা আমি ওদের এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে দেব না।

ছেলের বাবা কবির হোসেন (৫৬) বলেন, এখানে আমার ২২ শতাংশ জমি আছে। এই জমি আমি এখনো বুঝে পাইনি। অনেক বার মোকাদ্দেসকে আমার ২২ শতাংশ জমি বুঝিয়ে দিতে বলেছি। কিন্তু সে দেয়নি, তাই আমি বাধ্য হয়ে দেয়াল তুলেছি। আমাকে জমি বুঝিয়ে দিলে আমি দেয়াল তুলে নেব।

তবে এই বিষয়ে মেয়ের বাবা মোকাদ্দেস হোসেন ও তার পরিবারে অন্য সদস্যদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।

জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার ঢাকা পোস্টকে বলেন, জামালপুর পৌরসভার বেলটিয়া এলাকায় এক ব্যক্তির রাস্তা অবরোধ করার ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরাও আমাদেরকে অভিযোগ করেছেন। এই বিষয়ে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সে এর মধ্যে শুনানিও নিয়েছে এবং আমাদের যে সংশ্লিষ্ট উপ সহকারী (ভূমি) কর্মকর্তা তিনিও ঘটনাস্থলে গিয়েছেন এবং তদন্ত করেছেন। এটি আইনগত ভাবে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।