ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) রক্ষায় সেখানে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ মোতায়েন করেছিল ইসরায়েল। এছাড়া এটি পরিচালনার জন্য দেশটিতে বেশ ক’জন সেনাও পাঠিয়েছিল তেল আবিব।
রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো দেশে আয়রন ডোম পাঠানোর ঘটনা এটিই প্রথম।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর ক্রমাগত হামলা চালায় তেহরান। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরান দেশটিতে প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০-এর বেশি ড্রোন ছুড়েছে। এর ফলে এই যুদ্ধে ইসরায়েলসহ এই অঞ্চলের অন্য সব দেশের তুলনায় আরব আমিরাতকেই সবচেয়ে বেশি হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে হয়েছে।
পুরো যুদ্ধজুড়ে এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল ইরান। এরই অংশ হিসেবে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পাশাপাশি ইরান হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দেয়, যা জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত।
সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে ছোড়া বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব হলেও, বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতির মুখে বাধ্য হয়েই মিত্রদের কাছে সহযোগিতা চায় আবুধাবি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক্সিওস জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে এক ফোনালাপের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের নির্দেশ দেন। বলা হচ্ছে, এই আয়রন ডোম ব্যবস্থাটি ইরানের ছোড়া ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে।
২০২০ সালে স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। দুই দেশের এই সম্পর্কের নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইরানের দিক থেকে আসা অভিন্ন হুমকি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ও আমিরাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, দুই দেশ সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করতে যুদ্ধ চলাকালে দক্ষিণ ইরানে অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের কর্মকর্তারাই এখন বলছেন যে তাদের এই অংশীদারত্ব বর্তমানে নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েল যখন নিজে ব্যাপক হামলার মুখে ছিল, তখন দেশের বাইরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত খোদ ইসরায়েলিদের মধ্যেই ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে।
এক্সিওস আরও জানিয়েছে, আরব আমিরাতের মাটিতে ইসরায়েলি সেনার উপস্থিতি সে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় হতে পারে। তবে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক জ্যেষ্ঠ আমিরাতি কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধের সময় ইসরায়েল যে সহায়তা করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত তা কখনোই ভুলবে না।
এদিকে অন্য একজন আমিরাতি কর্মকর্তা যুদ্ধের সময় সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও অস্ট্রেলিয়ারও প্রশংসা করেছেন।
ইসরায়েলের বহুল আলোচিত এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার তালিকায় শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত একাই ছিল না। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময়ে আয়রন ডোম প্রযুক্তি চেয়ে ইসরায়েলের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তবে কিয়েভের সেই অনুরোধ বারবারই প্রত্যাখ্যান করেছে তেল আবিব।
এদিকে আয়রন ডোম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন। তবে আয়রন ডোম মূলত ভূমিভিত্তিক ব্যবস্থা হলেও ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই গোল্ডেন ডোম হবে মহাকাশভিত্তিক। এর লক্ষ্য হলো কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যা ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত, সেটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে তা ধ্বংস করতে সক্ষম হবে। এই আকাশ সুরক্ষা বলয় বা শিল্ডের আওতায় ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ট্র্যাকিংয়ের জন্য কয়েকশ স্যাটেলাইট মহাকাশে মোতায়েন করা হতে পারে।






















