বৈশ্বিক অস্থিরতা আর জ্বালানি সংকটের মাঝে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ, রাশিয়া এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম শুরু হয়, যা দেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি বড় প্রযুক্তিগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় দেশে বর্তমানে লোডশেডিং এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো সংকট তৈরি হয়েছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে রূপপুর প্রকল্পটি দ্রুত চালু হওয়া দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৬ এপ্রিল রিঅ্যাক্টর-১ এর যাবতীয় পরীক্ষা শেষে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এটি পরিচালনার লাইসেন্স প্রদান করে। আজ থেকে শুরু হওয়া ৩-৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ জ্বালানি স্থাপনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। একে বলা হয় ‘ফুয়েল লোডিং’, যার মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্মাণ পর্যায় থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদন বা ‘কমিশনিং’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে।
ফুয়েল লোডিং পরবর্তী ধাপসমূহ:
-
সময়সীমা: জ্বালানি স্থাপন সম্পন্ন হতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে।
-
ক্রিটিক্যালিটি টেস্ট: নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই শেষে রিঅ্যাক্টরের মোট তাপীয় ক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশ ব্যবহার করে প্রথম নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া ঘটানো হবে। একেই বলা হয় রিঅ্যাক্টরের ‘প্রাণ’ পাওয়া।
-
পরীক্ষামূলক উৎপাদন: ধাপে ধাপে ৫ শতাংশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করা হবে। পুরো কমিশনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
রূপপুরের প্রতিটি ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আধুনিক ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। একবার বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে এটি ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম, যা ‘বেজলোড প্ল্যান্ট’ হিসেবে কাজ করবে।
-
স্থায়িত্ব: প্রতিটি রিঅ্যাক্টর ৬০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম।
-
জ্বালানি সাশ্রয়: প্রতি ১৮ মাস পরপর মাত্র ২৫ টন ইউরেনিয়াম জ্বালানি পরিবর্তন করতে হয়। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ তেল বা কয়লা দিয়ে উৎপাদন করতে খরচ অনেক বেশি পড়ে।
-
বিনিয়োগ সুরক্ষা: ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই কেন্দ্রের প্রতিটি দিন সচল থাকা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রিঅ্যাক্টর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ দেশীয় জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

























