২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, খানকা ও দরবার শরীফে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাজার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনাগুলো জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মাজারগুলোতে হামলার হার আশঙ্কাজনক। পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৬৫টি স্থানে মোট ৬৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে সুফি সমাজভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’-এর পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলা চালানো হয়েছে। এসব সহিংসতায় ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪৬৮ জন। অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো বীভৎস ঘটনাও ঘটেছে।
সাধারণত ‘মব ভায়োলেন্স’ বলতে তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলাকে বোঝানো হলেও, মাজারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রতিটি হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো, ভিডিও বার্তা দেওয়া এবং বুলডোজারের মতো ভারি যন্ত্রপাতির ব্যবহার প্রমাণ করে যে এগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ‘মাকাম’-এর তথ্যমতে, অন্তত ৬টি ঘটনায় সরাসরি বুলডোজার ব্যবহার করা হয়েছে, যা সুসংগঠিত পরিকল্পনারই বহিঃপ্রকাশ।
হামলার ঘটনার বিপরীতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাজার হামলার ঘটনায় প্রায় ৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো মামলাই হয়নি। ‘মাকাম’-এর তথ্যানুযায়ী, ৯৭টি হামলার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি। অর্থাৎ ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা পরিলক্ষিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ভয়ে মামলা করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কুষ্টিয়ার মতো নৃশংস ঘটনার পর তীব্র জনরোষের মুখে মামলা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও তদন্তে উঠে এসেছে যে, এসব হামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাত্রসংগঠন বা ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যদের সামনের সারিতে দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের এই দীর্ঘসূত্রতা এবং ‘নীরবতা’ হামলাকারীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
একটি গণতান্ত্রিক ও সুষ্ঠু সমাজে ভিন্নমতের সহাবস্থান স্বাভাবিক হলেও সহিংসতা কখনোই কাম্য নয়। নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। মাজার ও দরবার শরীফগুলোতে শান্তি বজায় রাখতে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সরকারকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায়, এই আগুনের আঁচ সমাজের আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

























