দুই ম্যাচের হোম সিরিজে পাকিস্তানকে ২-০-তে হারানোর কৃতিত্ব দেখাল বাংলাদেশ। সিলেট টেস্টে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
পাকিস্তানের বিপক্ষে এ নিয়ে টানা দুইবার ২-০-তে সিরিজ জিতল টাইগাররা। ২০২৪ সালে পাকিস্তানকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে এসেছেন মুশফিকুর রহিম, লিটন দাসরা। এছাড়া নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে এ নিয়ে টানা চার ম্যাচে জয়ের কীর্তি গড়ল বাংলাদেশ দল। গত বছর তারা ২-০ ব্যবধানে আয়ারল্যান্ডকে হারায়। এবার ঘরের মাঠে তাদের কাছে ধরাশায়ী হলো পাকিস্তান।
সিলেট টেস্টে মঙ্গলবার চতুর্থ দিন শেষেই জয়ের সুবাস পাচ্ছিল বাংলাদেশ। তখন জয় থেকে মাত্র তিন উইকেট দূরে ছিল শান্তর দল। আর পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২১ রান। গতকাল শেষ দিন ১ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে জয় সুনিশ্চিত করে বাংলাদেশ। তাইজুল ইসলাম দুটি ও শরিফুল ইসলাম একটি উইকেট নিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন।
চতুর্থ ইনিংসে ১২০ রানে ছয় উইকেট শিকার করে এ জয়ের অন্যতম নায়ক তাইজুল। তবে সবচেয়ে বড় নায়ক লিটন দাস, যিনি প্রথম ইনিংসে দলের বিপর্যয় সামাল দিয়ে ১২৬ রানের বীরোচিত ইনিংস খেলেন। তার ওই ইনিংস বাংলাদেশকে এনে দেয় ২৭৮ রান। এরপর তাইজুল, নাহিদ রানা, মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাসকিন আহমেদরা মিলে পাকিস্তানকে ২৩২ রানে গুটিয়ে দেন।
প্রথম ইনিংসে মাত্র ৪৬ রানের লিড পেলেও সেটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনেক এগিয়ে রাখে বাংলাদেশকে। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকুর রহিমের ১৩৭ রানের ইনিংস আর লিটন দাসের ৬৯ ও মাহমুদুল হাসান জয়ের ৫২ দলকে এনে দেয় ৩৯০ রানের পুঁজি। পাকিস্তান পড়ে যায় ৪৩৭ রানের বিশাল টার্গেটের মুখে। এ রান তাড়া করে জিততে হলে ইতিহাস গড়তে হতো পাকিস্তানকে। ভাঙতে হতো ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪১৮ রান করে জেতার রেকর্ডটা। তবে পারেনি শান মাসুদের দল। মোহাম্মদ রিজওয়ান বুক চিতিয়ে লড়েও দলকে জয়ের কাছাকাছি নিতে পারেননি। অতিথি দলটি গুটিয়ে যায় ৩৫৮ রানে। কঠিন মিশনে গতকাল শেষ দিন ১১.২ ওভার আয়ু ছিল পাকিস্তান ইনিংসের।
সকালে শুরুতে স্বাগতিকদের চিন্তায় ফেলে দেন রিজওয়ান ও সাজিদ খান। প্রথম ইনিংসে ঝড়ো ব্যাট করা সাজিদ খান গতকালও দারুণ ব্যাটিং করতে থাকেন। ৩৬ বলে ২৮ রান করার পর তাকে থামিয়েছেন তাইজুল। স্লিপে তার ক্যাচ নেন শান্ত। দলের সংগ্রহ তখন ৩৫৮/৮। সেখানেই শেষ পাকিস্তান। এরপর আর কোনো রান না তুলেই বাকি দুটি উইকেট হারায় সফরকারীরা। সেঞ্চুরির কাছাকাছি থাকা রিজওয়ানকে ফেরান শরিফুল। ম্যাচে এটাই তার প্রথম উইকেট। শরিফুলের বলে কাট করতে গিয়ে গালিতে মিরাজের হাতে ক্যাচ তুলে দেন রিজওয়ান। এ উইকেট শিকারের পর টাইগার শিবির আর গ্যালারিতে যেন জয়োল্লাস শুরু হয়ে যায়। কেননা রিজওয়ানই ছিলেন বাংলাদেশের জয়ের পথে শেষ হার্ডল। পরের ওভারে খুব সহজেই খুররম শাহজাদকে আউট করে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন তাইজুল।
টেস্টে এই প্রথম পুরো ১০ দিন ‘পারফেক্ট’ ক্রিকেট খেলে প্রতিপক্ষকে হারাল বাংলাদেশ। পেস বোলাররা দুর্দান্ত আগ্রাসন দেখিয়েছেন, স্পিন ব্রিগেড অভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছে। আর ব্যাটিংয়ে অভিজ্ঞরা বিপদে হাল ধরেছেন।
জয় শেষে বাংলাদেশ দলনায়ক নাজমুল হোসেন তাই বললেন, ‘কৃতিত্ব গোটা দলেরই। দলের প্রত্যেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছেন।’ এ সময় তিনি কিউরেটর আর সব খেলোয়াড়কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
শান্ত বলেন, ‘আমি আমার বোলারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ফ্ল্যাট উইকেটে তারা দুর্দান্ত বোলিং করে গেছেন। এ জায়গায়ই আমরা উন্নতি আনতে চেয়েছিলাম। আশা করি, আমরা এভাবেই খেলে যাব।’
ব্যাটিং ইউনিট নিয়ে শান্ত বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা খুব বেশি উইকেট হারিয়ে ফেলেছি, তবে ইদানীং আমরা ভালো জুটিও পাচ্ছি। এমনকি আমাদের টেল এন্ডাররাও অবদান রেখেছেন। এমন কিছু জায়গায় আমরা উন্নতি আনতে চেয়েছি এবং সেটা পেরেছি। আশা করি, এটা আমরা ধরে রাখব।’
এ জয়ে আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে ভারতকে পেছনে ফেলে পঞ্চম স্থানে উঠে গেছে বাংলাদেশ। টাইগারদের অর্জন ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট, আর ৪৮.১৫ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ছয়ে ভারত। চার ম্যাচে দুই জয় ও এক ড্র বাংলাদেশের। ভারত নয় ম্যাচ খেলে চারটি জিতেছে, হার চারটি ও ড্র একটি। পাকিস্তান চার ম্যাচে জিতেছে একটি, মাত্র ৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে তারা টেবিলের অষ্টম স্থানে।
বাংলাদেশের ওপরে আছে অস্ট্রেলিয়া (৮৭.৫০ শতাংশ পয়েন্ট), নিউজিল্যান্ড (৭৭.৭৮ শতাংশ পয়েন্ট), দক্ষিণ আফ্রিকা (৭৫.০০ শতাংশ পয়েন্ট) ও শ্রীলংকা (৬৬.৬৭ শতাংশ পয়েন্ট)। গত বছর শ্রীলংকার মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন: প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জেতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের এমন সাফল্য অব্যাহত থাকবে এবং এ অর্জন তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি আরো অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আশা প্রকাশ করেন—দলীয় ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে আরো এগিয়ে যাবে। তিনি খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশ: ২৭৮ ও ৩৯০। পাকিস্তান: ২৩২ ও ৩৫৮/১০ (রিজওয়ান ৯৪, মাসুদ ৭১, সালমান ৭১; তাইজুল ৬/১২০, রানা ২/৭১)। ফল: বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: লিটন দাস। প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ: মুশফিকুর রহিম। সিরিজ: বাংলাদেশ ২-০-তে জয়ী।
























