ঢাকা ০৫:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশু আছিয়া থেকে রামিসা, এরপর কে?

শিশু আছিয়া থেকে রামিসা, এরপর কে?

দেশে মাত্র ১৫ মাসের ব্যবধানে আবারও একটি লোমহর্ষক ও নৃশংস শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটল। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খোদ রাজধানীতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছরের শিশু রামিসা নির্মমতার শিকার হয়েছে। প্রতিবেশীর পাশবিক নির্যাতনের পর রামিসাকে গলা কেটে হত্যা ও হাত বিচ্ছিন্ন করার মতো বীভৎস ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের চরম নিষ্ঠুরতায় বর্তমানে দেশজুড়ে অভিভাবকরা চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের কাছে এক ধরনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’র বার্তা দিচ্ছে। দৃশ্যমান ও কার্যকর শাস্তি না থাকায় নারীদের ওপর সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর দেশে ধর্ষণের ঘটনা ২৭ শতাংশ বেড়েছে, যার বিপরীতে প্রকৃত বিচার পাওয়ার হার নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গত বছরের ১৭ মে আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। মাত্র ১৪ কার্যদিবসে এই আলোচিত মামলার বিচারকাজ শেষ হলেও, রায় ঘোষণার এক বছর পরও হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের পরবর্তী অগ্রগতি অজানা রয়ে গেছে। দেশে নতুন নতুন ইস্যু আসার কারণে আছিয়ার ঘটনাটি যেন ধামাচাপা পড়ে গেছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে গত ২ মে প্রকাশিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকুসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:

  • সাজার হার: নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ।

  • খালাসের হার: প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে।

  • মামলা নিষ্পত্তির সময়: আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে।

  • শুনানির সংখ্যা: প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে কোনো কোনো মামলা শেষ হতে ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে রায় হওয়ার আগেই বাদী মারা যান কিংবা আসামি জামিনে বের হয়ে বাদীকে হুমকি দেয়। এছাড়া থানায় মামলা করতে গিয়ে জটিলতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ও মাতব্বরদের সালিশের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নজিরও রয়েছে।

বিচারব্যবস্থার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও অনীহা থেকে নিহত শিশু রামিসার ৫৫ বছর বয়সী বাবা আক্ষেপ করে জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো বিচার চান না। কারণ হিসেবে তিনি অতীতে বড় কোনো ঘটনার বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ১৫ দিন পর আরেকটি বড় ঘটনা এলে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি সবাই ভুলে যাবে।

আইনি প্রতিকার পেতে অতিরিক্ত বিলম্বের কারণে দেশে একের পর এক ভয়ংকর অপরাধীর জন্ম হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ:

  • রসু খাঁ: দেশের প্রথম নথিভুক্ত এই সিরিয়াল কিলার ও রেপিস্ট ১১ জন দরিদ্র পোশাককর্মীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছিল। ২০০৯ সালে গ্রেপ্তারের পর চাঁদপুরের আদালত এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও, দীর্ঘ ১৭ বছরেও তা কার্যকর হয়নি। সে বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে রয়েছে।

  • রাশেদুল ইসলাম রাব্বি: অতি সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া এই সিরিয়াল রেপিস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ে সেজে বন্ধুত্ব ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে মাত্র ২ মাসে ১৩ জন তরুণীকে ধর্ষণ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রসু খাঁর মতো অপরাধীদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা গেলে রাব্বির মতো নতুন অপরাধীর জন্ম হতো না।

আছিয়া বা রামিসার মতো আলোচিত ঘটনা ছাড়াও বহু শিশু লোকলজ্জা বা প্রভাবশালীদের চাপে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। বিচারহীনতার এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। সব শিশুর জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক বর্তমান সময়ের মূল লক্ষ্য।

শিশু আছিয়া থেকে রামিসা, এরপর কে?

আপডেট সময় : ০৫:২৭:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

দেশে মাত্র ১৫ মাসের ব্যবধানে আবারও একটি লোমহর্ষক ও নৃশংস শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটল। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খোদ রাজধানীতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছরের শিশু রামিসা নির্মমতার শিকার হয়েছে। প্রতিবেশীর পাশবিক নির্যাতনের পর রামিসাকে গলা কেটে হত্যা ও হাত বিচ্ছিন্ন করার মতো বীভৎস ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের চরম নিষ্ঠুরতায় বর্তমানে দেশজুড়ে অভিভাবকরা চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের কাছে এক ধরনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’র বার্তা দিচ্ছে। দৃশ্যমান ও কার্যকর শাস্তি না থাকায় নারীদের ওপর সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর দেশে ধর্ষণের ঘটনা ২৭ শতাংশ বেড়েছে, যার বিপরীতে প্রকৃত বিচার পাওয়ার হার নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গত বছরের ১৭ মে আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। মাত্র ১৪ কার্যদিবসে এই আলোচিত মামলার বিচারকাজ শেষ হলেও, রায় ঘোষণার এক বছর পরও হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের পরবর্তী অগ্রগতি অজানা রয়ে গেছে। দেশে নতুন নতুন ইস্যু আসার কারণে আছিয়ার ঘটনাটি যেন ধামাচাপা পড়ে গেছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে গত ২ মে প্রকাশিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকুসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:

  • সাজার হার: নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ।

  • খালাসের হার: প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে।

  • মামলা নিষ্পত্তির সময়: আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে।

  • শুনানির সংখ্যা: প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে কোনো কোনো মামলা শেষ হতে ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে রায় হওয়ার আগেই বাদী মারা যান কিংবা আসামি জামিনে বের হয়ে বাদীকে হুমকি দেয়। এছাড়া থানায় মামলা করতে গিয়ে জটিলতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ও মাতব্বরদের সালিশের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নজিরও রয়েছে।

বিচারব্যবস্থার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও অনীহা থেকে নিহত শিশু রামিসার ৫৫ বছর বয়সী বাবা আক্ষেপ করে জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো বিচার চান না। কারণ হিসেবে তিনি অতীতে বড় কোনো ঘটনার বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ১৫ দিন পর আরেকটি বড় ঘটনা এলে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি সবাই ভুলে যাবে।

আইনি প্রতিকার পেতে অতিরিক্ত বিলম্বের কারণে দেশে একের পর এক ভয়ংকর অপরাধীর জন্ম হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ:

  • রসু খাঁ: দেশের প্রথম নথিভুক্ত এই সিরিয়াল কিলার ও রেপিস্ট ১১ জন দরিদ্র পোশাককর্মীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছিল। ২০০৯ সালে গ্রেপ্তারের পর চাঁদপুরের আদালত এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও, দীর্ঘ ১৭ বছরেও তা কার্যকর হয়নি। সে বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে রয়েছে।

  • রাশেদুল ইসলাম রাব্বি: অতি সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া এই সিরিয়াল রেপিস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ে সেজে বন্ধুত্ব ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে মাত্র ২ মাসে ১৩ জন তরুণীকে ধর্ষণ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রসু খাঁর মতো অপরাধীদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা গেলে রাব্বির মতো নতুন অপরাধীর জন্ম হতো না।

আছিয়া বা রামিসার মতো আলোচিত ঘটনা ছাড়াও বহু শিশু লোকলজ্জা বা প্রভাবশালীদের চাপে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। বিচারহীনতার এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। সব শিশুর জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক বর্তমান সময়ের মূল লক্ষ্য।