ঢাকা ০৭:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ওয়ারিশ সূত্রে’ ভুগছে হাদির ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার

‘ওয়ারিশ সূত্রে’ ভুগছে হাদির ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির গড়া সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ এখন আর্থিক স্বচ্ছতা ও উত্তরাধিকার প্রশ্নে টালমাটাল অবস্থার মুখে পড়েছে। এই জটিলতার জেরে সংগঠনের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের ও সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ মোট ৬ জন দায়িত্বশীল একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই সাপেক্ষে সেন্টারটি দাবিদারদের হাতে তুলে দেওয়ারও ঘোষণা এসেছে তাদের পক্ষ থেকে।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এই ‘উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা দাবি’র কথাকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন হাদির বোন মাছুমা হাদি। তার ভাষ্য, এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

বিষয়টির প্রকৃত কারণ জানতে যোগাযোগ করা হয় হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদীর সঙ্গে। তবে তিনি এ নিয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরিবর্তে তিনি বোন মাছুমা হাদির একটি লিখিত বিবৃতি প্রতিবেদকের কাছে পাঠিয়ে দেন।

সেই বিবৃতিতে মাছুমা হাদি প্রশ্ন তোলেন—বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার ভাইয়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কেবল মা, স্ত্রী ও সন্তান। এই তিনজনের মধ্যে আসলে কে সেন্টারের দায়িত্ব দাবি করছে, সেই প্রশ্নই তিনি সামনে আনেন।

ইনকিলাব মঞ্চ পরিচালিত এই সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে যারা পদত্যাগ করেছেন তারা হলেন—চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের, সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমা, সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ফাহিম আব্দুল্লাহ, অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রায়হান এবং উপ-নির্বাহী পরিচালক হাবিবুল্লাহ মিসবাহ।

 

 

প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে রাজধানীর বাংলামোটরে যান প্রতিবেদক। বাংলামোটর মোড় থেকে মাত্র এক মিনিট হাঁটা দূরত্বে লিংক রোডের খোদেজা খাতুন স্কুল গলিতে অবস্থিত ডোমিনিয়ন রওশন ভিলা ভবনের তৃতীয় তলায় সেন্টারটির অবস্থান। ভবনে প্রবেশমুখেই রয়েছে নিরাপত্তা স্ক্যানার।

ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সুসজ্জিত বইয়ের তাক। দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন শিল্পকর্ম, ক্যালিগ্রাফি এবং প্রতিবাদী চিত্রকর্ম। এ ছাড়া কেন্দ্রের নানা স্থানে জুলাই আন্দোলন ও সমকালীন বিষয়ভিত্তিক আর্টওয়ার্ক ও পোস্টারও প্রদর্শিত হচ্ছে।

সেন্টারের তত্ত্বাবধানে থাকা রাফসান রাকিব জানান, সপ্তাহে ছয় দিনই নিয়মিত কার্যক্রম চলে, শুধু রোববার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। তার ভাষ্যমতে, বর্তমানে সব দায়িত্বশীল স্বপদে বহাল আছেন এবং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলমান। দায়িত্ব ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে কারা তা গ্রহণ করবেন, সে বিষয়ে তিনি এখনই কিছু বলতে পারেননি।

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের জানান, তারা এই মুহূর্তে চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত এলাকায় অবস্থান করছেন এবং ঢাকায় ফিরে বিস্তারিত ব্রিফ করবেন। তিনি স্পষ্ট করেন, সেন্টারের দায়িত্ব এখনো তাদের হাতেই রয়েছে।

 

 

এর আগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, শহীদ ওসমান হাদি জীবদ্দশায় সেন্টারের ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিলেও তা সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এটি জনতার আমানত হিসেবে পরিচিত হওয়ায় গত ছয় মাস ধরে শাহাদাত-পরবর্তী উত্থাপিত ওয়ারিশ ইস্যু সমাধানের চেষ্টা চলছিল। এর মাঝেই নানা প্রোডাক্টিভ পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল, যা এখনো চলমান। তবে বিষয়টি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও লেখেন, শহীদ ওসমান হাদিকে আল্লাহ যে মর্যাদা দিয়েছেন তার প্রতি সম্মান জানিয়ে, ওয়ারিশদের দাবি ও প্রয়োজনীয় দলিলাদি যাচাই সাপেক্ষে সেন্টার দাবিদারদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সম্মানের জন্য তিনি চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন বলেও জানান।

উল্লেখ্য, জাবের ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব এবং হাদি হত্যা মামলার বাদীও। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন তিনি, যা পরে হাদির মৃত্যুর পর হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ জানান, শহীদ ওসমান হাদির অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়েই তিনি অল্প কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু নানা অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও ক্রমাগত মানসিক চাপে এই লড়াই দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল বলে জানান তিনি।

তার ভাষায়, শহীদ ওসমান হাদি এই সেন্টারকে জনতার আমানত হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর নানাভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেও বিষয়গুলো এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে যে তা তার পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করে।

ইনকিলাব মঞ্চের একাধিক সূত্র জানায়, সেন্টারের আর্থিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ বিরোধ শুরু হয়। বিশেষত পরিবারের পক্ষ থেকে আয়-ব্যয়ের সম্পূর্ণ হিসাব চাওয়া হলে দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। অনুদান, লেনদেন ও ব্যয়ের স্পষ্ট বিবরণ জানতে চাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল রূপ নেয়।

ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাও তার ফেসবুক পোস্টে হাদির মৃত্যুর পর সেন্টার নিয়ে ওয়ারিশ সংক্রান্ত জটিলতা সামনে আসার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

মাছুমা হাদি বলেন, সামাজিক মাধ্যম থেকেই তিনি পদত্যাগের খবর জানতে পেরেছেন। পদত্যাগ করা বা না করা যে কারো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করলেও, ওয়ারিশ সূত্রে পরিবার সেন্টারের দায়িত্ব নিতে চাইছে—এই দাবিকে তিনি সরাসরি মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। তার মতে, কোরআনিক বিধান ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন—উভয় অনুযায়ীই তার ভাইয়ের একমাত্র উত্তরাধিকারী মা, স্ত্রী ও সন্তান।

তিনি জানান, পরিবার বলতে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান সবাইকে বোঝালেও, তাদের মধ্যে আসলে কে সেন্টারের দায়িত্ব দাবি করছে তা স্পষ্ট নয়। ভাইয়ের শাহাদাতের পর তিনি নিজে ভাইয়ের লড়াইকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন—নির্বাচনে অংশ নেওয়া, ভাইয়ের কবর স্থায়ীকরণ, নেইমপ্লেট স্থাপন এবং শহীদের তালিকায় গেজেটভুক্তির মতো কাজগুলো সেন্টারের সবার সহযোগিতায় সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানান, কোনো পদ-পদবির আশা না করে শুধু ভাইয়ের সহযোদ্ধাদের পাশে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার ফোনকলও রিসিভ করা হয়নি।

মাছুমা হাদি আরও জানান, কোরবানির সময় সেন্টার থেকে খালিদ সাইফুল্লাহসহ তিনজন তার কাছে গিয়ে সব ভুলে সেন্টারে ফেরার অনুরোধ জানান। জবাবে তিনি বলেছিলেন, নলছিটিতে থাকার কারণে সেন্টারে তার কোনো কাজ নেই এবং যা হারানোর তা তিনি ইতোমধ্যে হারিয়েছেন। তিনি তাদের নিজেদের মতো কাজ চালিয়ে যাওয়ার এবং ওসমান হাদির আদর্শ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্বশীলদের পদত্যাগের ঘটনায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন—এর পেছনে কার এজেন্ডা কাজ করছে এবং একজন শহীদের পরিবারকে কেন বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে।

তিনি জানান, ওমর হাদি প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সেন্টারের দায়িত্বশীল পদে থাকায় তাকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নমিনি করা হয়েছিল। মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমাট (ফ্রিজ) হয়ে যাওয়ায়, ওমর বিদেশে থাকা অবস্থায়ও তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টির সমাধান সম্ভব ছিল বলে মনে করেন তিনি। এ অবস্থায় মিথ্যাচারের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মাছুমা হাদি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শরীফ ওসমান বিন হাদি। তারই উদ্যোগে গড়ে ওঠে সংগঠনটির সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন বই প্রকাশনা ও সৃজনশীল আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুত আলোচনায় আসে কেন্দ্রটি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে প্রতিষ্ঠাতা শরীফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে একাধিকবার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কলকাতায় ১৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদে নামাজ বন্ধ করলো শুভেন্দু সরকার

‘ওয়ারিশ সূত্রে’ ভুগছে হাদির ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার

আপডেট সময় : ১০:৪৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির গড়া সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ এখন আর্থিক স্বচ্ছতা ও উত্তরাধিকার প্রশ্নে টালমাটাল অবস্থার মুখে পড়েছে। এই জটিলতার জেরে সংগঠনের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের ও সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ মোট ৬ জন দায়িত্বশীল একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই সাপেক্ষে সেন্টারটি দাবিদারদের হাতে তুলে দেওয়ারও ঘোষণা এসেছে তাদের পক্ষ থেকে।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এই ‘উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা দাবি’র কথাকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন হাদির বোন মাছুমা হাদি। তার ভাষ্য, এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

বিষয়টির প্রকৃত কারণ জানতে যোগাযোগ করা হয় হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদীর সঙ্গে। তবে তিনি এ নিয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরিবর্তে তিনি বোন মাছুমা হাদির একটি লিখিত বিবৃতি প্রতিবেদকের কাছে পাঠিয়ে দেন।

সেই বিবৃতিতে মাছুমা হাদি প্রশ্ন তোলেন—বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার ভাইয়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কেবল মা, স্ত্রী ও সন্তান। এই তিনজনের মধ্যে আসলে কে সেন্টারের দায়িত্ব দাবি করছে, সেই প্রশ্নই তিনি সামনে আনেন।

ইনকিলাব মঞ্চ পরিচালিত এই সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে যারা পদত্যাগ করেছেন তারা হলেন—চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের, সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমা, সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ফাহিম আব্দুল্লাহ, অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রায়হান এবং উপ-নির্বাহী পরিচালক হাবিবুল্লাহ মিসবাহ।

 

 

প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে রাজধানীর বাংলামোটরে যান প্রতিবেদক। বাংলামোটর মোড় থেকে মাত্র এক মিনিট হাঁটা দূরত্বে লিংক রোডের খোদেজা খাতুন স্কুল গলিতে অবস্থিত ডোমিনিয়ন রওশন ভিলা ভবনের তৃতীয় তলায় সেন্টারটির অবস্থান। ভবনে প্রবেশমুখেই রয়েছে নিরাপত্তা স্ক্যানার।

ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সুসজ্জিত বইয়ের তাক। দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন শিল্পকর্ম, ক্যালিগ্রাফি এবং প্রতিবাদী চিত্রকর্ম। এ ছাড়া কেন্দ্রের নানা স্থানে জুলাই আন্দোলন ও সমকালীন বিষয়ভিত্তিক আর্টওয়ার্ক ও পোস্টারও প্রদর্শিত হচ্ছে।

সেন্টারের তত্ত্বাবধানে থাকা রাফসান রাকিব জানান, সপ্তাহে ছয় দিনই নিয়মিত কার্যক্রম চলে, শুধু রোববার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। তার ভাষ্যমতে, বর্তমানে সব দায়িত্বশীল স্বপদে বহাল আছেন এবং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলমান। দায়িত্ব ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে কারা তা গ্রহণ করবেন, সে বিষয়ে তিনি এখনই কিছু বলতে পারেননি।

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের জানান, তারা এই মুহূর্তে চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত এলাকায় অবস্থান করছেন এবং ঢাকায় ফিরে বিস্তারিত ব্রিফ করবেন। তিনি স্পষ্ট করেন, সেন্টারের দায়িত্ব এখনো তাদের হাতেই রয়েছে।

 

 

এর আগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, শহীদ ওসমান হাদি জীবদ্দশায় সেন্টারের ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিলেও তা সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এটি জনতার আমানত হিসেবে পরিচিত হওয়ায় গত ছয় মাস ধরে শাহাদাত-পরবর্তী উত্থাপিত ওয়ারিশ ইস্যু সমাধানের চেষ্টা চলছিল। এর মাঝেই নানা প্রোডাক্টিভ পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল, যা এখনো চলমান। তবে বিষয়টি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও লেখেন, শহীদ ওসমান হাদিকে আল্লাহ যে মর্যাদা দিয়েছেন তার প্রতি সম্মান জানিয়ে, ওয়ারিশদের দাবি ও প্রয়োজনীয় দলিলাদি যাচাই সাপেক্ষে সেন্টার দাবিদারদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সম্মানের জন্য তিনি চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন বলেও জানান।

উল্লেখ্য, জাবের ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব এবং হাদি হত্যা মামলার বাদীও। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন তিনি, যা পরে হাদির মৃত্যুর পর হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ জানান, শহীদ ওসমান হাদির অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়েই তিনি অল্প কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু নানা অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও ক্রমাগত মানসিক চাপে এই লড়াই দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল বলে জানান তিনি।

তার ভাষায়, শহীদ ওসমান হাদি এই সেন্টারকে জনতার আমানত হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর নানাভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেও বিষয়গুলো এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে যে তা তার পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করে।

ইনকিলাব মঞ্চের একাধিক সূত্র জানায়, সেন্টারের আর্থিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ বিরোধ শুরু হয়। বিশেষত পরিবারের পক্ষ থেকে আয়-ব্যয়ের সম্পূর্ণ হিসাব চাওয়া হলে দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। অনুদান, লেনদেন ও ব্যয়ের স্পষ্ট বিবরণ জানতে চাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল রূপ নেয়।

ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাও তার ফেসবুক পোস্টে হাদির মৃত্যুর পর সেন্টার নিয়ে ওয়ারিশ সংক্রান্ত জটিলতা সামনে আসার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

মাছুমা হাদি বলেন, সামাজিক মাধ্যম থেকেই তিনি পদত্যাগের খবর জানতে পেরেছেন। পদত্যাগ করা বা না করা যে কারো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করলেও, ওয়ারিশ সূত্রে পরিবার সেন্টারের দায়িত্ব নিতে চাইছে—এই দাবিকে তিনি সরাসরি মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। তার মতে, কোরআনিক বিধান ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন—উভয় অনুযায়ীই তার ভাইয়ের একমাত্র উত্তরাধিকারী মা, স্ত্রী ও সন্তান।

তিনি জানান, পরিবার বলতে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান সবাইকে বোঝালেও, তাদের মধ্যে আসলে কে সেন্টারের দায়িত্ব দাবি করছে তা স্পষ্ট নয়। ভাইয়ের শাহাদাতের পর তিনি নিজে ভাইয়ের লড়াইকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন—নির্বাচনে অংশ নেওয়া, ভাইয়ের কবর স্থায়ীকরণ, নেইমপ্লেট স্থাপন এবং শহীদের তালিকায় গেজেটভুক্তির মতো কাজগুলো সেন্টারের সবার সহযোগিতায় সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানান, কোনো পদ-পদবির আশা না করে শুধু ভাইয়ের সহযোদ্ধাদের পাশে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার ফোনকলও রিসিভ করা হয়নি।

মাছুমা হাদি আরও জানান, কোরবানির সময় সেন্টার থেকে খালিদ সাইফুল্লাহসহ তিনজন তার কাছে গিয়ে সব ভুলে সেন্টারে ফেরার অনুরোধ জানান। জবাবে তিনি বলেছিলেন, নলছিটিতে থাকার কারণে সেন্টারে তার কোনো কাজ নেই এবং যা হারানোর তা তিনি ইতোমধ্যে হারিয়েছেন। তিনি তাদের নিজেদের মতো কাজ চালিয়ে যাওয়ার এবং ওসমান হাদির আদর্শ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্বশীলদের পদত্যাগের ঘটনায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন—এর পেছনে কার এজেন্ডা কাজ করছে এবং একজন শহীদের পরিবারকে কেন বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে।

তিনি জানান, ওমর হাদি প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সেন্টারের দায়িত্বশীল পদে থাকায় তাকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নমিনি করা হয়েছিল। মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমাট (ফ্রিজ) হয়ে যাওয়ায়, ওমর বিদেশে থাকা অবস্থায়ও তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টির সমাধান সম্ভব ছিল বলে মনে করেন তিনি। এ অবস্থায় মিথ্যাচারের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মাছুমা হাদি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শরীফ ওসমান বিন হাদি। তারই উদ্যোগে গড়ে ওঠে সংগঠনটির সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন বই প্রকাশনা ও সৃজনশীল আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুত আলোচনায় আসে কেন্দ্রটি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে প্রতিষ্ঠাতা শরীফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে একাধিকবার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।