ঢাকা ০৯:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের মধ্যপ্রদেশ ‌‘গো-রক্ষকদের’ সাজা দিয়ে প্রাণনাশের হুমকিতে বিচারক

ভারতের মধ্যপ্রদেশ ‌‘গো-রক্ষকদের’ সাজা দিয়ে প্রাণনাশের হুমকিতে বিচারক

ভারতের মধ্যপ্রদেশে গরু পাচারের সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর রায় ঘোষণাকারী নারী বিচারক তাবাসসুম খান এখন নিজেই অনলাইনে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। ঘটনার জেরে তাকে পুলিশি নিরাপত্তা দিতে হয়েছে এবং দেশের শীর্ষ বিচার বিভাগীয় সংগঠনগুলো তার পাশে দাঁড়িয়েছে।

গত ১২ জুন মধ্যপ্রদেশের একটি আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান হত্যা, হত্যাচেষ্টা, দাঙ্গা ও বেআইনিভাবে পথরোধের অভিযোগে ১৪ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। মামলাটি ২০২২ সালের একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে গবাদি পশু পরিবহনের সময় ৫০ বছর বয়সী নাজির আহমদের পথ আটকান লাঠি-রডধারী একদল স্বঘোষিত ‘গো-রক্ষক’। ভারতের অনেক রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং হিন্দুধর্মে গরুকে পবিত্র মনে করা হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে।

অভিযুক্তরা নাজির আহমদ ও তার দুই সঙ্গীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে বেধড়ক পেটান, যাতে নাজির আহমদ মারা যান। তার সঙ্গী দুজন বেঁচে গিয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেন, যা রায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিচারক খান এই ঘটনাকে সুস্পষ্ট গণপিটুনির ঘটনা বলে আখ্যা দেন।

রায় ঘোষণার পরপরই দণ্ডিত ব্যক্তিদের পরিবার আদালত চত্বরে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানায় এবং প্রিজন ভ্যান আটকানোর চেষ্টা করে। তাদের দাবি, গরু রক্ষার কারণেই এই ব্যক্তিরা শাস্তি পাচ্ছেন। এরপরই হিন্দু ডানপন্থী প্রভাবশালীরা বিচারক খানের বিরুদ্ধে অনলাইনে সাম্প্রদায়িক ভাষায় আক্রমণ, ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি সংবলিত ভিডিও ছড়াতে শুরু করেন। একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, ১০ দিনের মধ্যে আসামিদের মুক্তি না দেওয়া হলে দেশজুড়ে রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি তৈরি হবে। এসব ভিডিও অনলাইনে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো লাইক-শেয়ার পায়, যেখানে হুমকিদাতাদের পরিচয় স্পষ্ট দৃশ্যমান।

একটি ডানপন্থী হিন্দি সংবাদ চ্যানেলের উপস্থাপকও দণ্ডিতদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে দর্শকদের গো-রক্ষকদের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। ২২ জুন পাঞ্জাবে ‘গো রক্ষা পরিষদ’-এর বিক্ষোভে বিচারক খানের কুশপুতুল পোড়ানো হয়, আর তিন দিন পর উত্তরপ্রদেশে ‘রাষ্ট্রীয় বজরং দল’ একই দাবিতে মিছিল করে।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন, এই হুমকি ও বিক্ষোভ শুধু রায়ের সমালোচনা নয়, বরং বিচারকের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরে তার বিচারিক কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা। তিনি বলেন, বিচারিক সিদ্ধান্ত আইনি যুক্তিতে যাচাই হওয়া উচিত, বিচারকের ধর্ম দিয়ে নয়। কাটজুর মতে, বিচারক খান তাকে জানিয়েছেন যে এই হুমকি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে এবং ন্যায্য রায় দেওয়াটাই যেন তার অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে। বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিকাশ সিং বলেন, বিচারকের প্রতি হুমকি গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই নাড়া দেয়, তাই ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া বিচারকাজ পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

পুলিশ কর্মকর্তা সুধাকর বারাসকর জানান, ভারতীয় দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাইবার সেল উসকানিমূলক ভিডিও প্রচারকারীদের শনাক্তে কাজ করছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে মনে করিয়ে দেন, বোম্বে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি গৌতম প্যাটেল ও তার পরিবারও ২০২৪ সালে একটি উত্তরাধিকার মামলার রায়ের পর ১০ মাসেরও বেশি সময় হুমকির মুখে ছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে বোম্বে হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। হেগড়ের মতে, একজন অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারক যদি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে একজন কর্মরত জেলা জজও একই সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী— এই নীতি কোনো পদ, ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করতে পারে না।

সবশেষে জানা গেছে, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট গত সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে বিচারক খানের নিরাপত্তা ও হুমকিদাতাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চেয়েছে এবং তার পুলিশি নিরাপত্তা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফতুল্লায় র‍্যাব হামলা মামলার আসামি গিট্টু রিপন কক্সবাজারে গ্রেফতার

ভারতের মধ্যপ্রদেশ ‌‘গো-রক্ষকদের’ সাজা দিয়ে প্রাণনাশের হুমকিতে বিচারক

আপডেট সময় : ১১:২৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

ভারতের মধ্যপ্রদেশে গরু পাচারের সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর রায় ঘোষণাকারী নারী বিচারক তাবাসসুম খান এখন নিজেই অনলাইনে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। ঘটনার জেরে তাকে পুলিশি নিরাপত্তা দিতে হয়েছে এবং দেশের শীর্ষ বিচার বিভাগীয় সংগঠনগুলো তার পাশে দাঁড়িয়েছে।

গত ১২ জুন মধ্যপ্রদেশের একটি আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান হত্যা, হত্যাচেষ্টা, দাঙ্গা ও বেআইনিভাবে পথরোধের অভিযোগে ১৪ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। মামলাটি ২০২২ সালের একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে গবাদি পশু পরিবহনের সময় ৫০ বছর বয়সী নাজির আহমদের পথ আটকান লাঠি-রডধারী একদল স্বঘোষিত ‘গো-রক্ষক’। ভারতের অনেক রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং হিন্দুধর্মে গরুকে পবিত্র মনে করা হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে।

অভিযুক্তরা নাজির আহমদ ও তার দুই সঙ্গীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে বেধড়ক পেটান, যাতে নাজির আহমদ মারা যান। তার সঙ্গী দুজন বেঁচে গিয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেন, যা রায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিচারক খান এই ঘটনাকে সুস্পষ্ট গণপিটুনির ঘটনা বলে আখ্যা দেন।

রায় ঘোষণার পরপরই দণ্ডিত ব্যক্তিদের পরিবার আদালত চত্বরে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানায় এবং প্রিজন ভ্যান আটকানোর চেষ্টা করে। তাদের দাবি, গরু রক্ষার কারণেই এই ব্যক্তিরা শাস্তি পাচ্ছেন। এরপরই হিন্দু ডানপন্থী প্রভাবশালীরা বিচারক খানের বিরুদ্ধে অনলাইনে সাম্প্রদায়িক ভাষায় আক্রমণ, ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি সংবলিত ভিডিও ছড়াতে শুরু করেন। একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, ১০ দিনের মধ্যে আসামিদের মুক্তি না দেওয়া হলে দেশজুড়ে রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি তৈরি হবে। এসব ভিডিও অনলাইনে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো লাইক-শেয়ার পায়, যেখানে হুমকিদাতাদের পরিচয় স্পষ্ট দৃশ্যমান।

একটি ডানপন্থী হিন্দি সংবাদ চ্যানেলের উপস্থাপকও দণ্ডিতদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে দর্শকদের গো-রক্ষকদের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। ২২ জুন পাঞ্জাবে ‘গো রক্ষা পরিষদ’-এর বিক্ষোভে বিচারক খানের কুশপুতুল পোড়ানো হয়, আর তিন দিন পর উত্তরপ্রদেশে ‘রাষ্ট্রীয় বজরং দল’ একই দাবিতে মিছিল করে।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন, এই হুমকি ও বিক্ষোভ শুধু রায়ের সমালোচনা নয়, বরং বিচারকের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরে তার বিচারিক কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা। তিনি বলেন, বিচারিক সিদ্ধান্ত আইনি যুক্তিতে যাচাই হওয়া উচিত, বিচারকের ধর্ম দিয়ে নয়। কাটজুর মতে, বিচারক খান তাকে জানিয়েছেন যে এই হুমকি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে এবং ন্যায্য রায় দেওয়াটাই যেন তার অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে। বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিকাশ সিং বলেন, বিচারকের প্রতি হুমকি গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই নাড়া দেয়, তাই ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া বিচারকাজ পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

পুলিশ কর্মকর্তা সুধাকর বারাসকর জানান, ভারতীয় দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাইবার সেল উসকানিমূলক ভিডিও প্রচারকারীদের শনাক্তে কাজ করছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে মনে করিয়ে দেন, বোম্বে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি গৌতম প্যাটেল ও তার পরিবারও ২০২৪ সালে একটি উত্তরাধিকার মামলার রায়ের পর ১০ মাসেরও বেশি সময় হুমকির মুখে ছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে বোম্বে হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। হেগড়ের মতে, একজন অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারক যদি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে একজন কর্মরত জেলা জজও একই সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী— এই নীতি কোনো পদ, ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করতে পারে না।

সবশেষে জানা গেছে, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট গত সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে বিচারক খানের নিরাপত্তা ও হুমকিদাতাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চেয়েছে এবং তার পুলিশি নিরাপত্তা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।