ঢাকা ০৬:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপিরা

স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপিরা

আদালতের স্টে-অর্ডারে আড়ালে দেড় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ: সমাধানে ‘ল’ কমিশনের দ্বারস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক
ঢাকা: দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধে এবার বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ বা ‘স্টে-অর্ডার’ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করেও নিয়মিত গ্রাহকের সুবিধা ভোগ করার প্রবণতা রোধে আইনি ও নীতিগত সমাধানের পথ খুঁজছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সংকট নিরসনে দ্রুতই ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৮ লাখ কোটি টাকা বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণ টানা ছয় মাস পরিশোধ না করলে তা খেলাপি হিসেবে গণ্য হয়। নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি গ্রাহকরা নতুন ঋণ, আমদানি-রপ্তানি সুবিধা এমনকি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারান। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এক হাজারের বেশি বড় গ্রাহক উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নিয়মিত সুবিধা ভোগ করছেন।

বর্তমানে দেশে স্বীকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার ঋণ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি দেখানো যাচ্ছে না। এই দুই অঙ্ক যোগ করলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা।

গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, স্টে-অর্ডার সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে একটি যৌথ সভা আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, সিআইবি এবং আইন বিভাগ এই প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, স্থগিতাদেশ থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, স্টে-অর্ডারের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন হলেও আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কীভাবে এই সংকটের টেকসই সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সবার মতামত নেওয়া হচ্ছে।

বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী জানান, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক চতুর ঋণগ্রহীতা স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ করছেন না। তার মতে, আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিলেও যেন ব্যাংকের খাতায় ঋণের স্ট্যাটাস পরিবর্তন না হয় বা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে, এমন নিয়ম করা জরুরি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, “আমরা খেলাপি ঋণের মামলা ও স্টে-অর্ডার ইস্যু নিয়ে ল’ কমিশনের সঙ্গে সভার প্রস্তাব দিয়েছি এবং গভর্নর তাতে সম্মতি দিয়েছেন।”

এবিবি’র একগুচ্ছ কঠোর প্রস্তাব
খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বেশ কিছু কঠোর প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি। তাদের প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে:

খেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও ছবি প্রকাশ।

ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।

আদালতে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘ডাউনপেমেন্ট’ বাধ্যতামূলক করা।

স্টে-অর্ডার থাকা অবস্থায় কিস্তিভিত্তিক অর্থ পরিশোধের শর্তারোপ।

বেশি খেলাপি থাকা জেলাগুলোতে পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপন।

দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ঋণের পরিমাণভেদে সর্বোচ্চ ৭ বছরে উন্নীত করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য আদালতের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা নয়; বরং এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা যাতে ব্যাংক খাত কৃত্রিম সংকটে না পড়ে। কারণ, স্থগিতাদেশের কারণে নিয়মিত দেখানো এসব ঋণ থেকে ব্যাংকের কোনো প্রকৃত আয় হচ্ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপিরা

স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপিরা

আপডেট সময় : ০৯:০০:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আদালতের স্টে-অর্ডারে আড়ালে দেড় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ: সমাধানে ‘ল’ কমিশনের দ্বারস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক
ঢাকা: দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধে এবার বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ বা ‘স্টে-অর্ডার’ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করেও নিয়মিত গ্রাহকের সুবিধা ভোগ করার প্রবণতা রোধে আইনি ও নীতিগত সমাধানের পথ খুঁজছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সংকট নিরসনে দ্রুতই ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৮ লাখ কোটি টাকা বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণ টানা ছয় মাস পরিশোধ না করলে তা খেলাপি হিসেবে গণ্য হয়। নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি গ্রাহকরা নতুন ঋণ, আমদানি-রপ্তানি সুবিধা এমনকি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারান। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এক হাজারের বেশি বড় গ্রাহক উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নিয়মিত সুবিধা ভোগ করছেন।

বর্তমানে দেশে স্বীকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার ঋণ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি দেখানো যাচ্ছে না। এই দুই অঙ্ক যোগ করলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা।

গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, স্টে-অর্ডার সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে একটি যৌথ সভা আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, সিআইবি এবং আইন বিভাগ এই প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, স্থগিতাদেশ থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, স্টে-অর্ডারের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন হলেও আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কীভাবে এই সংকটের টেকসই সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সবার মতামত নেওয়া হচ্ছে।

বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী জানান, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক চতুর ঋণগ্রহীতা স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ করছেন না। তার মতে, আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিলেও যেন ব্যাংকের খাতায় ঋণের স্ট্যাটাস পরিবর্তন না হয় বা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে, এমন নিয়ম করা জরুরি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, “আমরা খেলাপি ঋণের মামলা ও স্টে-অর্ডার ইস্যু নিয়ে ল’ কমিশনের সঙ্গে সভার প্রস্তাব দিয়েছি এবং গভর্নর তাতে সম্মতি দিয়েছেন।”

এবিবি’র একগুচ্ছ কঠোর প্রস্তাব
খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বেশ কিছু কঠোর প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি। তাদের প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে:

খেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও ছবি প্রকাশ।

ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।

আদালতে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘ডাউনপেমেন্ট’ বাধ্যতামূলক করা।

স্টে-অর্ডার থাকা অবস্থায় কিস্তিভিত্তিক অর্থ পরিশোধের শর্তারোপ।

বেশি খেলাপি থাকা জেলাগুলোতে পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপন।

দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ঋণের পরিমাণভেদে সর্বোচ্চ ৭ বছরে উন্নীত করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য আদালতের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা নয়; বরং এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা যাতে ব্যাংক খাত কৃত্রিম সংকটে না পড়ে। কারণ, স্থগিতাদেশের কারণে নিয়মিত দেখানো এসব ঋণ থেকে ব্যাংকের কোনো প্রকৃত আয় হচ্ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।