দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের চিকিৎসায় ব্যয়ভার সামলাতে গিয়ে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বিশেষ করে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) এবং দীর্ঘ মেয়াদী সুচিকিৎসার প্রয়োজনে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন অভিভাবকেরা।
সন্তান হারিয়ে দিশাহারা কুষ্টিয়ার সাকিবুর কুষ্টিয়া সদরের মুদিদোকানি সাকিবুর রহমান গত সোমবার তার আট মাস বয়সী সন্তান ফালাককে হারিয়েছেন। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রাজশাহীর বেসরকারি পিআইসিইউ—মাত্র ১৯ দিনের চিকিৎসায় তার খরচ হয়েছে এক লাখ টাকারও বেশি। একদিকে চিকিৎসার জন্য করা বিশাল অংকের ধারদেনা, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আয়হীন জীবন; সব মিলিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন এই বাবা।
চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে পকেট থেকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও সব সুযোগ-সুবিধা মিলছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সিরিঞ্জ, স্যালাইন থেকে শুরু করে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনে দিতে হচ্ছে। এছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত এবং হাসপাতালে থাকা স্বজনদের খাবারের খরচ যোগাতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।
গাজীপুরের গাড়িচালক সোহাগ ভূঁইয়ার অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক। তার চার মাস বয়সী ছেলে রেদোয়ানের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের পিআইসিইউ খরচ যোগাতে তিনি এখন সর্বস্বান্ত।
সরকারি পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে হামে ৩২ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ১৯ হাজার ১৬১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন, যাদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা গুরুতর।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও পরামর্শ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মঈনুল আহসান স্বীকার করেছেন যে, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় পিআইসিইউ, দক্ষ জনবল ও যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রেফার না করে স্থানীয় হাসপাতালেই চিকিৎসা সম্পন্ন করার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ জানান, হামের এই চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি করোনার মতো হামের জন্যও একটি পৃথক সেল গঠন এবং সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পিআইসিইউ শয্যার রিয়েল-টাইম তথ্য সংরক্ষণের তাগিদ দেন।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যমতে, দেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৯ শতাংশই সাধারণ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা হামের মতো সংক্রামক ব্যাধির সময় সাধারণ পরিবারগুলোকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলছে।



























