ঢাকা ০৩:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রংপুরে সৌরবিদ্যুতে সেচ মৌসুমে সাশ্রয় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বজুড়ে নিরবিচ্ছন্নভাবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যহত হচ্ছে। এতে করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা চেপে বসেছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজেল প্রাপ্তিতে অনেক কৃষকই ভোগান্তির শিকার হওয়ায় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমন বাস্তবতায় রংপুরে আশার আলো দেখাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। সোলার প্যানেল বা সূর্যের আলো ব্যবহার করে এ অঞ্চলে প্রতিদিন ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এতে প্রতি সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব বলে মনে করে খাতসংশ্লিষ্টরা।

এতে ডিজেল ভোগান্তি নিয়ে শঙ্কামুক্ত থাকা কৃষকরা আছেন হাসি মুখে। পাশাপাশি নেট মিটারিং চালুর মাধ্যমে কৃষক ও সরকার উভয়ে লাভবান হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে নতুন করে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচযন্ত্র পরিচালনার প্রকল্প চালু না থাকায় কৃষক লাভবান হতে পারছেন না।

মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের জুম্মা গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসি’র ডাগওয়েল পরিচালনা করেন মাহমুদ হাসান শুভ। তিনি জানান, তার এলাকায় ব্যাপক হারে ভুট্টা, কলাসহ সব ধরনের সবজি আবাদ হয়। তিনি ১০ বিঘা জমি পর্যন্ত জমিতে সেচ দিতে পারেন। ডাগওয়েলটি যেহেতু সৌরবিদ্যুতে চলে তাই বর্তমানে জ্বালানি তেলের প্রাপ্তি কঠিন হলেও কৃষকদের কোনো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না।

শুভর দাবি, বছরের চার মাস সেচ দেওয়ার পর বলতে গেলে বাকি আট মাস এগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকছে। তাই অনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে দেওয়ার মাধ্যমে নেট মিটারিং চালু করলে তারা সবাই লাভবান হতো।

সরেজমিনে দেখা যায়, সোলার প্যানেল থেকে সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে যন্ত্রের মাধ্যমে সেই পানি যাচ্ছে কৃষি জমির সেচ কাজে। সোলার প্যানেলে মাধ্যমে পাম্প চলছে, নেই তেল খরচ কিংবা লোডশেডিংয়ের ঝামেলা। জীবাশ্ম জ্বালানির রাহুমুক্ত হয়ে নবায়নযোগ্য এই পদ্ধতিতে সেচ খরচ কমেছে অর্ধেক।

একজন চাষি বলেন, তেলের জন্য চিন্তা নেই। সোলার থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে পানিটা পাব আমরা। ফসল ভালো হবে। খরচটাও কম লাগবে। এতে সুবিধা আছে।

আরেকজন চাষি বলেন, অনেক সময় কারেন্ট থাকে আবার থাকে না। সেজন্য অনেক সময়ই দেখা যেত সঠিক সময়ে পানি পাওয়া যেত না। আর এখন সোলারের মাধ্যমে সবসময় পানি পাওয়া যায়। এখানে তো কোনো সমস্যা নেই।

কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়নের কৃষক মুক্তার আলী বলেন, তিস্তা নদী বেষ্টিত বিস্তীর্ণ চর এলাকায় একটা সময় সেচের অভাবে শত শত জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। স্বচ্ছল ব্যক্তিরা নিজ খরচে শ্যালোমেশিন দিয়ে আবাদের চেষ্টা করতেন। এজন্য পরিশ্রমের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পেতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চরের অনেক জমিতে এখন নিয়মিত আবাদ হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারে অনেকেই সেচ সুবিধা পাচ্ছে।

এ ধরনের প্রকল্পকে কৃষির জন্য আশীর্বাদ বলছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা । তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত, খাদ্য ব্যবস্থাপনা গতিশীল করার পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়নের লক্ষ্যেই এ ধরণের প্রকল্প চালু রাখতে হবে। প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য ফেরাতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এর সম্প্রসারণ ও সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী (নির্মাণ) প্রকৌশলী হুসাইন মোহাম্মদ আলতাফ বলেন, ২০২২ সালের পর সোলারের আর কোনো প্রকল্প বর্তমানে চালু নেই। চার মাস সেচ দেওয়ার পরও বছরে বাকি আট মাস এ সোলারগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই নেট মিটারিং চালু করা যেতে পারে।

উদাহরণ দিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, গত সেচ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় বিদ্যমান ৫৯৬টি সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচযন্ত্র সচল ছিল। একেকটি সেচযন্ত্রে গড়ে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে ৫ হাজার ৯৬০ কিলোওয়াট অর্থাৎ ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রতিদিন উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে দেয়া সম্ভব, যা দিয়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৮৫ হাজার ফ্যান চালানো সম্ভব। একই সঙ্গে সেচ মৌসুমে চার মাসে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়।

বিএমডিএ রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, ২০২২ সালের পর সোলারচালিত কোনো প্রকল্প নতুন করে চালু হয়নি। তবে আগেরগুলো এখনো চালু আছে।

তিনি আরও বলেন, মাঠে তাদের দুটি নেট মিটারিং চালু আছে। এছাড়া তাদের অফিস ভবনে স্থাপনকৃত সোলার সিস্টেমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নেট মিটিং করা হচ্ছে।

সোলার পরিচালিত সেচযন্ত্রগুলো নেট মিটারিংয়ে আনা প্রসঙ্গে নেসকো রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে সোলার সেচযন্ত্রগুলো পল্লী বিদ্যুতের এলাকায় অবস্থিত। তাই এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।

রংপুরে সৌরবিদ্যুতে সেচ মৌসুমে সাশ্রয় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল

আপডেট সময় : ০২:২২:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বজুড়ে নিরবিচ্ছন্নভাবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যহত হচ্ছে। এতে করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা চেপে বসেছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজেল প্রাপ্তিতে অনেক কৃষকই ভোগান্তির শিকার হওয়ায় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমন বাস্তবতায় রংপুরে আশার আলো দেখাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। সোলার প্যানেল বা সূর্যের আলো ব্যবহার করে এ অঞ্চলে প্রতিদিন ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এতে প্রতি সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব বলে মনে করে খাতসংশ্লিষ্টরা।

এতে ডিজেল ভোগান্তি নিয়ে শঙ্কামুক্ত থাকা কৃষকরা আছেন হাসি মুখে। পাশাপাশি নেট মিটারিং চালুর মাধ্যমে কৃষক ও সরকার উভয়ে লাভবান হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে নতুন করে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচযন্ত্র পরিচালনার প্রকল্প চালু না থাকায় কৃষক লাভবান হতে পারছেন না।

মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের জুম্মা গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসি’র ডাগওয়েল পরিচালনা করেন মাহমুদ হাসান শুভ। তিনি জানান, তার এলাকায় ব্যাপক হারে ভুট্টা, কলাসহ সব ধরনের সবজি আবাদ হয়। তিনি ১০ বিঘা জমি পর্যন্ত জমিতে সেচ দিতে পারেন। ডাগওয়েলটি যেহেতু সৌরবিদ্যুতে চলে তাই বর্তমানে জ্বালানি তেলের প্রাপ্তি কঠিন হলেও কৃষকদের কোনো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না।

শুভর দাবি, বছরের চার মাস সেচ দেওয়ার পর বলতে গেলে বাকি আট মাস এগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকছে। তাই অনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে দেওয়ার মাধ্যমে নেট মিটারিং চালু করলে তারা সবাই লাভবান হতো।

সরেজমিনে দেখা যায়, সোলার প্যানেল থেকে সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে যন্ত্রের মাধ্যমে সেই পানি যাচ্ছে কৃষি জমির সেচ কাজে। সোলার প্যানেলে মাধ্যমে পাম্প চলছে, নেই তেল খরচ কিংবা লোডশেডিংয়ের ঝামেলা। জীবাশ্ম জ্বালানির রাহুমুক্ত হয়ে নবায়নযোগ্য এই পদ্ধতিতে সেচ খরচ কমেছে অর্ধেক।

একজন চাষি বলেন, তেলের জন্য চিন্তা নেই। সোলার থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে পানিটা পাব আমরা। ফসল ভালো হবে। খরচটাও কম লাগবে। এতে সুবিধা আছে।

আরেকজন চাষি বলেন, অনেক সময় কারেন্ট থাকে আবার থাকে না। সেজন্য অনেক সময়ই দেখা যেত সঠিক সময়ে পানি পাওয়া যেত না। আর এখন সোলারের মাধ্যমে সবসময় পানি পাওয়া যায়। এখানে তো কোনো সমস্যা নেই।

কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়নের কৃষক মুক্তার আলী বলেন, তিস্তা নদী বেষ্টিত বিস্তীর্ণ চর এলাকায় একটা সময় সেচের অভাবে শত শত জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। স্বচ্ছল ব্যক্তিরা নিজ খরচে শ্যালোমেশিন দিয়ে আবাদের চেষ্টা করতেন। এজন্য পরিশ্রমের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পেতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চরের অনেক জমিতে এখন নিয়মিত আবাদ হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারে অনেকেই সেচ সুবিধা পাচ্ছে।

এ ধরনের প্রকল্পকে কৃষির জন্য আশীর্বাদ বলছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা । তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত, খাদ্য ব্যবস্থাপনা গতিশীল করার পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়নের লক্ষ্যেই এ ধরণের প্রকল্প চালু রাখতে হবে। প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য ফেরাতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এর সম্প্রসারণ ও সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী (নির্মাণ) প্রকৌশলী হুসাইন মোহাম্মদ আলতাফ বলেন, ২০২২ সালের পর সোলারের আর কোনো প্রকল্প বর্তমানে চালু নেই। চার মাস সেচ দেওয়ার পরও বছরে বাকি আট মাস এ সোলারগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই নেট মিটারিং চালু করা যেতে পারে।

উদাহরণ দিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, গত সেচ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় বিদ্যমান ৫৯৬টি সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচযন্ত্র সচল ছিল। একেকটি সেচযন্ত্রে গড়ে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে ৫ হাজার ৯৬০ কিলোওয়াট অর্থাৎ ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রতিদিন উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে দেয়া সম্ভব, যা দিয়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৮৫ হাজার ফ্যান চালানো সম্ভব। একই সঙ্গে সেচ মৌসুমে চার মাসে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়।

বিএমডিএ রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, ২০২২ সালের পর সোলারচালিত কোনো প্রকল্প নতুন করে চালু হয়নি। তবে আগেরগুলো এখনো চালু আছে।

তিনি আরও বলেন, মাঠে তাদের দুটি নেট মিটারিং চালু আছে। এছাড়া তাদের অফিস ভবনে স্থাপনকৃত সোলার সিস্টেমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নেট মিটিং করা হচ্ছে।

সোলার পরিচালিত সেচযন্ত্রগুলো নেট মিটারিংয়ে আনা প্রসঙ্গে নেসকো রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে সোলার সেচযন্ত্রগুলো পল্লী বিদ্যুতের এলাকায় অবস্থিত। তাই এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।