ঢাকা ১১:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা পুরুষের জন্য যখন ভয়ের কারণ

প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা পুরুষের জন্য যখন ভয়ের কারণ

পুরুষের বয়স ৫০ পার হলেই শরীরে নানা রকম পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম একটি সাধারণ কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো প্রোস্টেট গ্রন্থির সমস্যা। মূত্রথলির ঠিক নিচে থাকা সুপারির মতো ছোট এই গ্রন্থিটি বীর্য তৈরিতে সাহায্য করে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি আকারে বড় হতে থাকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বিনাইন এনলার্জমেন্ট অব প্রোস্টেট’ (বিইপি) বলা হয়। অনেকেই একে বয়সজনিত সাধারণ সমস্যা মনে করলেও, সঠিক সময়ে সচেতন না হলে এটি বড় জটিলতার কারণ হতে পারে। উল্লেখ্য, প্রোস্টেট বড় হওয়া মানেই কিন্তু ক্যানসার নয়।

প্রোস্টেট সমস্যার প্রধান লক্ষণসমূহ

যেহেতু মূত্রনালিটি প্রোস্টেট গ্রন্থির ভেতর দিয়ে যায়, তাই এই গ্রন্থিটি আকারে বড় হলে প্রস্রাবের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন:

  • দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি (১০ বারের বেশি) প্রস্রাবের বেগ হওয়া।

  • প্রস্রাবের চাপ এলে তা ধরে রাখতে না পারা, এমনকি বাথরুমে যাওয়ার আগেই বের হয়ে যাওয়া।

  • রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে যাওয়া।

  • প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগা এবং এর গতি কমে যাওয়া।

  • প্রস্রাব করার সময় মাঝে মাঝে থেমে যাওয়া এবং শেষ দিকে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া।

  • প্রস্রাব করার পরেও পুরোপুরি মলত্যাগ না হওয়ার অনুভূতি বা থলিতে প্রস্রাব জমে থাকার আভাস পাওয়া।

অবহেলা করলে যেসব জটিলতা হতে পারে

এই সমস্যাকে অবহেলা করলে একপর্যায়ে প্রস্রাব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসকরা ‘অ্যাকিউটর রিটেনশন’ বলেন। এছাড়া দীর্ঘদিন মূত্রথলিতে প্রস্রাব জমে থাকার কারণে কিডনি ফুলে যেতে পারে (হাইড্রোনেফ্রোসিস) এবং শেষ পর্যন্ত কিডনি বিকল বা ফেইলিওরের মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তবে লক্ষণ থাকলেই যে সবসময় বড় রোগ হবে তা নয়, আবার প্রোস্টেট ক্যানসার হলেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ক্যানসারের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের হাড়ে ব্যথা হওয়া আরেকটি অন্যতম লক্ষণ।

রোগ নির্ণয়ের উপায়

সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করতে পারলে জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব। এর জন্য বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা রয়েছে:

  • শারীরিক পরীক্ষা: অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা মলদ্বার দিয়ে আঙুলের সাহায্যে প্রোস্টেটের আকার ও ইনফেকশন বা ক্যানসারের ঝুঁকি আছে কিনা তা বুঝতে পারেন।

  • আলট্রাসনোগ্রাম: কিডনি, মূত্রথলি ও প্রোস্টেটের আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে গ্রন্থির আকার এবং কিডনির অবস্থা জানা যায়।

  • ইউরোফ্লোমেট্রি ও ইউরিন টেস্ট: প্রস্রাবের গতি পরিমাপ এবং ইনফেকশন বা জ্বালাপোড়া পরীক্ষা করতে এটি করা হয়।

  • পিএসএ ও বায়োপসি: রক্তের পিএসএ (PSA) পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ণয় করা হয়। পিএসএ স্থায়ীভাবে বেশি থাকলে আলট্রাসনোগ্রাম গাইডেড বায়োপসি করে ক্যানসার নিশ্চিত করা হয়।

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা

প্রোস্টেট বড় হলেই যে অস্ত্রোপচার বা ওষুধের প্রয়োজন হবে, বিষয়টি তেমন নয়। যদি লক্ষণের তীব্রতা কম থাকে, প্রস্রাবের গতি ঠিক থাকে এবং মূত্রথলিতে ৫০ মিলিগ্রামের কম প্রস্রাব জমা থাকে, তবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই চলে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীকে ওষুধের মাধ্যমেই সুস্থ করা সম্ভব।

ওষুধে কাজ না হলে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পেট না কেটেই প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে মেশিনের (ইলেকট্রিক লুপ বা লেজার) মাধ্যমে সফল ও নিরাপদ অস্ত্রোপচার করা সম্ভব। আর ক্যানসার যদি প্রাথমিক স্তরে থাকে, তবে তা অপারেশন (পেট কেটে, ল্যাপারোসকোপি বা রোবটিক সার্জারি) করে পুরোপুরি অপসারণ করা যায়। বিকল্প হিসেবে রেডিওথেরাপি বা পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন কমিয়েও এর বৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব।

প্রোস্টেট সুস্থ রাখতে করণীয়

সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ স্থূল ব্যক্তিদের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে।

  • খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, ফাইবারযুক্ত খাবার, মাছ, বাদাম ও অলিভ অয়েল রাখুন।

  • অতিরিক্ত লাল মাংস, প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়, ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন।

  • ৫০ বছরের পর নিয়মিত রক্তের পিএসএ পরীক্ষা করুন। পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে বিআরসিএ (BRCA) জিনের মিউটেশন পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো।

  • সন্ধ্যা বা রাতের দিকে অতিরিক্ত পানি, চা বা কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

  • অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় কিছু ওষুধ বয়স্কদের প্রস্রাব হঠাৎ আটকে দিতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন বা বন্ধ করবেন না।

নিয়ম মেনে চলা এবং সঠিক সময়ে সচেতনতাই পারে প্রোস্টেটের এই সমস্ত জটিল সমস্যা থেকে পুরুষদের মুক্ত রাখতে।

তথ্যসূত্র: ডা. আজফার উদ্দিন শেখ, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইউরোলজি ও অ্যান্ড্রোলজি, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণ

প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা পুরুষের জন্য যখন ভয়ের কারণ

আপডেট সময় : ০১:২২:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

পুরুষের বয়স ৫০ পার হলেই শরীরে নানা রকম পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম একটি সাধারণ কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো প্রোস্টেট গ্রন্থির সমস্যা। মূত্রথলির ঠিক নিচে থাকা সুপারির মতো ছোট এই গ্রন্থিটি বীর্য তৈরিতে সাহায্য করে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি আকারে বড় হতে থাকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বিনাইন এনলার্জমেন্ট অব প্রোস্টেট’ (বিইপি) বলা হয়। অনেকেই একে বয়সজনিত সাধারণ সমস্যা মনে করলেও, সঠিক সময়ে সচেতন না হলে এটি বড় জটিলতার কারণ হতে পারে। উল্লেখ্য, প্রোস্টেট বড় হওয়া মানেই কিন্তু ক্যানসার নয়।

প্রোস্টেট সমস্যার প্রধান লক্ষণসমূহ

যেহেতু মূত্রনালিটি প্রোস্টেট গ্রন্থির ভেতর দিয়ে যায়, তাই এই গ্রন্থিটি আকারে বড় হলে প্রস্রাবের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন:

  • দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি (১০ বারের বেশি) প্রস্রাবের বেগ হওয়া।

  • প্রস্রাবের চাপ এলে তা ধরে রাখতে না পারা, এমনকি বাথরুমে যাওয়ার আগেই বের হয়ে যাওয়া।

  • রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে যাওয়া।

  • প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগা এবং এর গতি কমে যাওয়া।

  • প্রস্রাব করার সময় মাঝে মাঝে থেমে যাওয়া এবং শেষ দিকে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া।

  • প্রস্রাব করার পরেও পুরোপুরি মলত্যাগ না হওয়ার অনুভূতি বা থলিতে প্রস্রাব জমে থাকার আভাস পাওয়া।

অবহেলা করলে যেসব জটিলতা হতে পারে

এই সমস্যাকে অবহেলা করলে একপর্যায়ে প্রস্রাব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসকরা ‘অ্যাকিউটর রিটেনশন’ বলেন। এছাড়া দীর্ঘদিন মূত্রথলিতে প্রস্রাব জমে থাকার কারণে কিডনি ফুলে যেতে পারে (হাইড্রোনেফ্রোসিস) এবং শেষ পর্যন্ত কিডনি বিকল বা ফেইলিওরের মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তবে লক্ষণ থাকলেই যে সবসময় বড় রোগ হবে তা নয়, আবার প্রোস্টেট ক্যানসার হলেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ক্যানসারের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের হাড়ে ব্যথা হওয়া আরেকটি অন্যতম লক্ষণ।

রোগ নির্ণয়ের উপায়

সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করতে পারলে জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব। এর জন্য বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা রয়েছে:

  • শারীরিক পরীক্ষা: অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা মলদ্বার দিয়ে আঙুলের সাহায্যে প্রোস্টেটের আকার ও ইনফেকশন বা ক্যানসারের ঝুঁকি আছে কিনা তা বুঝতে পারেন।

  • আলট্রাসনোগ্রাম: কিডনি, মূত্রথলি ও প্রোস্টেটের আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে গ্রন্থির আকার এবং কিডনির অবস্থা জানা যায়।

  • ইউরোফ্লোমেট্রি ও ইউরিন টেস্ট: প্রস্রাবের গতি পরিমাপ এবং ইনফেকশন বা জ্বালাপোড়া পরীক্ষা করতে এটি করা হয়।

  • পিএসএ ও বায়োপসি: রক্তের পিএসএ (PSA) পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ণয় করা হয়। পিএসএ স্থায়ীভাবে বেশি থাকলে আলট্রাসনোগ্রাম গাইডেড বায়োপসি করে ক্যানসার নিশ্চিত করা হয়।

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা

প্রোস্টেট বড় হলেই যে অস্ত্রোপচার বা ওষুধের প্রয়োজন হবে, বিষয়টি তেমন নয়। যদি লক্ষণের তীব্রতা কম থাকে, প্রস্রাবের গতি ঠিক থাকে এবং মূত্রথলিতে ৫০ মিলিগ্রামের কম প্রস্রাব জমা থাকে, তবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই চলে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীকে ওষুধের মাধ্যমেই সুস্থ করা সম্ভব।

ওষুধে কাজ না হলে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পেট না কেটেই প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে মেশিনের (ইলেকট্রিক লুপ বা লেজার) মাধ্যমে সফল ও নিরাপদ অস্ত্রোপচার করা সম্ভব। আর ক্যানসার যদি প্রাথমিক স্তরে থাকে, তবে তা অপারেশন (পেট কেটে, ল্যাপারোসকোপি বা রোবটিক সার্জারি) করে পুরোপুরি অপসারণ করা যায়। বিকল্প হিসেবে রেডিওথেরাপি বা পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন কমিয়েও এর বৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব।

প্রোস্টেট সুস্থ রাখতে করণীয়

সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ স্থূল ব্যক্তিদের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে।

  • খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, ফাইবারযুক্ত খাবার, মাছ, বাদাম ও অলিভ অয়েল রাখুন।

  • অতিরিক্ত লাল মাংস, প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়, ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন।

  • ৫০ বছরের পর নিয়মিত রক্তের পিএসএ পরীক্ষা করুন। পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে বিআরসিএ (BRCA) জিনের মিউটেশন পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো।

  • সন্ধ্যা বা রাতের দিকে অতিরিক্ত পানি, চা বা কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

  • অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় কিছু ওষুধ বয়স্কদের প্রস্রাব হঠাৎ আটকে দিতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন বা বন্ধ করবেন না।

নিয়ম মেনে চলা এবং সঠিক সময়ে সচেতনতাই পারে প্রোস্টেটের এই সমস্ত জটিল সমস্যা থেকে পুরুষদের মুক্ত রাখতে।

তথ্যসূত্র: ডা. আজফার উদ্দিন শেখ, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইউরোলজি ও অ্যান্ড্রোলজি, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা।