ঢাকা ০৩:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার অপরাজেয় ইতিহাস

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার অপরাজেয় ইতিহাস

বিশ্বকাপের মঞ্চে বহু শক্তিশালী দলই সেমিফাইনালে হোঁচট খেয়েছে। ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি কিংবা ফ্রান্স—প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় শেষ চার থেকে বিদায় নিয়েছে। তবে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে চিত্রটা একেবারেই আলাদা। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা আজও পর্যন্ত একবারও হারেনি।

১৯৩০ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত মোট পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলেছে দলটি। আর প্রতিবারই তারা জায়গা করে নিয়েছে ফাইনালে। ফিফা নিজেও এই রেকর্ডকে আর্জেন্টিনার অন্যতম বিরল অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মজার বিষয় হলো, প্রতিটি সেমিফাইনালেই একজন করে নায়ক আবির্ভূত হয়েছেন, যাদের হাত ধরে দলটি পৌঁছে গেছে শিরোপার লড়াইয়ে।

১৯৩০: স্টাবিলের নৈপুণ্যে প্রথম ফাইনাল

বিশ্বকাপের একদম প্রথম আসরেই ইতিহাস গড়ে আর্জেন্টিনা। মন্টেভিডিওর সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা উড়িয়ে দেয় ৬-১ গোলে। ফলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে দলটি।

সেই ম্যাচের মূল নায়ক ছিলেন স্ট্রাইকার গিয়ের্মো স্টাবিলে, যিনি একাই করেন দুটি গোল। এছাড়া কার্লোস পেউসেলও জোড়া গোল করেন। বাকি দুটি গোল আসে আলেসান্দ্রো স্কোপেল্লি ও লুইস মন্তিওর কাছ থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, পুরো টুর্নামেন্টে আট গোল করে গোল্ডেন বুটও জিতে নেন স্টাবিলে।

১৯৮৬: ম্যারাডোনার একক বীরত্ব

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় সেমিফাইনাল পারফরম্যান্সগুলোর একটি এসেছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনালের পর বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও তিনিই ছিলেন সব আলোচনার কেন্দ্রে।

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে দুই অর্ধে দুটি অসাধারণ গোল করেন তিনি। ফলে ২-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। আসলে পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন ম্যারাডোনা যে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপকে অনেকে একজন মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের গল্প বলেই মনে করেন।

১৯৯০: গোইকোচিয়ার অলৌকিক টাইব্রেকার

চার বছর পর দৃশ্যপট পাল্টে যায় সম্পূর্ণভাবে। শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা তখন খেলছিল স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষে, নেপলসের সান পাওলো স্টেডিয়ামে। সালভাতোরে স্কিলাচির গোলে পিছিয়ে পড়লেও ক্লদিও কানিজিয়ার হেডে সমতা ফেরায় দলটি।

অতিরিক্ত সময়েও কোনো ফল না আসায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই জন্ম নেয় গোলরক্ষক সার্জিও গোইকোচিয়ার কিংবদন্তি রাত। ইতালির দুটি শট ঠেকিয়ে একাই দলকে ফাইনালে তুলে দেন তিনি। আজও এই টাইব্রেকার বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১৪: রোমেরোর দৃঢ়তায় থমকে যায় নেদারল্যান্ডস

দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে ফের সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের সাও পাওলোতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১২০ মিনিটেও কোনো দল গোলের দেখা পায়নি। যদিও লিওনেল মেসি পুরো ম্যাচেই নেতৃত্ব দেন, তবে আসল নায়ক হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো।

টাইব্রেকারে রন ফ্লার ও ওয়েসলি স্নাইডারের শট রুখে দেন তিনি। এদিকে আর্জেন্টিনার চার শুটারই লক্ষ্যভেদে সফল হন। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে রোমেরোর হাতে, আর তার নৈপুণ্যেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফাইনালে পা রাখে আর্জেন্টিনা।

২০২২: মেসি-আলভারেজ জুটির বিস্ফোরণ

কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল ছিল মেসির পূর্ণতার আরেকটি প্রমাণ। প্রথমে পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি। এরপর যোশকো গভার্দিওলকে কাটিয়ে অসাধারণ এক প্রচেষ্টায় বল বাড়ান জুলিয়ান আলভারেজের দিকে, যা থেকে আসে আরেকটি গোল।

আলভারেজ নিজেও জোড়া গোল করে বসেন। ফলে ৩-০ ব্যবধানের বড় জয়ে ষষ্ঠবারের মতো ফাইনালে পৌঁছায় আর্জেন্টিনা। কয়েকদিন পরই পূর্ণ হয় মেসির আজীবনের স্বপ্ন।

এবার কি লেখা হবে ষষ্ঠ অধ্যায়?

১৯৩০-এ স্টাবিলে, ১৯৮৬-তে ম্যারাডোনা, ১৯৯০-এ গোইকোচিয়া, ২০১৪-তে রোমেরো এবং ২০২২-এ মেসি-আলভারেজ—প্রতিটি সেমিফাইনালেই নতুন এক নায়ক জন্ম নিয়েছেন। তাই বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল আর্জেন্টিনার কাছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং এটি যেন নায়ক তৈরির এক মঞ্চ।

এবার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। প্রশ্ন একটাই—আর্জেন্টিনা কি তাদের শতভাগ সেমিফাইনাল রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখবে, নাকি অবশেষে ভাঙবে ৯৬ বছরের এই অদম্য ধারাবাহিকতা?

জনপ্রিয় সংবাদ

আর্জেন্টিনার দুর্গ ভাঙতে টুখেলের চার মাস্টারপ্ল্যান

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার অপরাজেয় ইতিহাস

আপডেট সময় : ০২:২০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপের মঞ্চে বহু শক্তিশালী দলই সেমিফাইনালে হোঁচট খেয়েছে। ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি কিংবা ফ্রান্স—প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় শেষ চার থেকে বিদায় নিয়েছে। তবে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে চিত্রটা একেবারেই আলাদা। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা আজও পর্যন্ত একবারও হারেনি।

১৯৩০ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত মোট পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলেছে দলটি। আর প্রতিবারই তারা জায়গা করে নিয়েছে ফাইনালে। ফিফা নিজেও এই রেকর্ডকে আর্জেন্টিনার অন্যতম বিরল অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মজার বিষয় হলো, প্রতিটি সেমিফাইনালেই একজন করে নায়ক আবির্ভূত হয়েছেন, যাদের হাত ধরে দলটি পৌঁছে গেছে শিরোপার লড়াইয়ে।

১৯৩০: স্টাবিলের নৈপুণ্যে প্রথম ফাইনাল

বিশ্বকাপের একদম প্রথম আসরেই ইতিহাস গড়ে আর্জেন্টিনা। মন্টেভিডিওর সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা উড়িয়ে দেয় ৬-১ গোলে। ফলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে দলটি।

সেই ম্যাচের মূল নায়ক ছিলেন স্ট্রাইকার গিয়ের্মো স্টাবিলে, যিনি একাই করেন দুটি গোল। এছাড়া কার্লোস পেউসেলও জোড়া গোল করেন। বাকি দুটি গোল আসে আলেসান্দ্রো স্কোপেল্লি ও লুইস মন্তিওর কাছ থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, পুরো টুর্নামেন্টে আট গোল করে গোল্ডেন বুটও জিতে নেন স্টাবিলে।

১৯৮৬: ম্যারাডোনার একক বীরত্ব

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় সেমিফাইনাল পারফরম্যান্সগুলোর একটি এসেছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনালের পর বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও তিনিই ছিলেন সব আলোচনার কেন্দ্রে।

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে দুই অর্ধে দুটি অসাধারণ গোল করেন তিনি। ফলে ২-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। আসলে পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন ম্যারাডোনা যে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপকে অনেকে একজন মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের গল্প বলেই মনে করেন।

১৯৯০: গোইকোচিয়ার অলৌকিক টাইব্রেকার

চার বছর পর দৃশ্যপট পাল্টে যায় সম্পূর্ণভাবে। শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা তখন খেলছিল স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষে, নেপলসের সান পাওলো স্টেডিয়ামে। সালভাতোরে স্কিলাচির গোলে পিছিয়ে পড়লেও ক্লদিও কানিজিয়ার হেডে সমতা ফেরায় দলটি।

অতিরিক্ত সময়েও কোনো ফল না আসায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই জন্ম নেয় গোলরক্ষক সার্জিও গোইকোচিয়ার কিংবদন্তি রাত। ইতালির দুটি শট ঠেকিয়ে একাই দলকে ফাইনালে তুলে দেন তিনি। আজও এই টাইব্রেকার বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১৪: রোমেরোর দৃঢ়তায় থমকে যায় নেদারল্যান্ডস

দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে ফের সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলের সাও পাওলোতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১২০ মিনিটেও কোনো দল গোলের দেখা পায়নি। যদিও লিওনেল মেসি পুরো ম্যাচেই নেতৃত্ব দেন, তবে আসল নায়ক হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো।

টাইব্রেকারে রন ফ্লার ও ওয়েসলি স্নাইডারের শট রুখে দেন তিনি। এদিকে আর্জেন্টিনার চার শুটারই লক্ষ্যভেদে সফল হন। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে রোমেরোর হাতে, আর তার নৈপুণ্যেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফাইনালে পা রাখে আর্জেন্টিনা।

২০২২: মেসি-আলভারেজ জুটির বিস্ফোরণ

কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল ছিল মেসির পূর্ণতার আরেকটি প্রমাণ। প্রথমে পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি। এরপর যোশকো গভার্দিওলকে কাটিয়ে অসাধারণ এক প্রচেষ্টায় বল বাড়ান জুলিয়ান আলভারেজের দিকে, যা থেকে আসে আরেকটি গোল।

আলভারেজ নিজেও জোড়া গোল করে বসেন। ফলে ৩-০ ব্যবধানের বড় জয়ে ষষ্ঠবারের মতো ফাইনালে পৌঁছায় আর্জেন্টিনা। কয়েকদিন পরই পূর্ণ হয় মেসির আজীবনের স্বপ্ন।

এবার কি লেখা হবে ষষ্ঠ অধ্যায়?

১৯৩০-এ স্টাবিলে, ১৯৮৬-তে ম্যারাডোনা, ১৯৯০-এ গোইকোচিয়া, ২০১৪-তে রোমেরো এবং ২০২২-এ মেসি-আলভারেজ—প্রতিটি সেমিফাইনালেই নতুন এক নায়ক জন্ম নিয়েছেন। তাই বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল আর্জেন্টিনার কাছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং এটি যেন নায়ক তৈরির এক মঞ্চ।

এবার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। প্রশ্ন একটাই—আর্জেন্টিনা কি তাদের শতভাগ সেমিফাইনাল রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখবে, নাকি অবশেষে ভাঙবে ৯৬ বছরের এই অদম্য ধারাবাহিকতা?