নিজস্ব প্রতিবেদক,
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত ৫৪ প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের টাকা সরানোর অভিযোগের তদন্তের কারণেই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন নিয়ে টালবাহানা করেছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন সে সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার বৈঠকের নানা ঘটনাও তিনি সংসদে প্রকাশ করেন।
রবিবার রাতে সংসদে এসব কথা বলেন দীপু মনি। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ তোলার পেছনে ড. ইউনূসকে দায়ী করেন।
২০১০ সালে পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর কথা থাকলেও ওই বছর দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে অর্থায়ন স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। পরে ২০১৩ সালের ৩০ জুন অর্থায়ন বাতিল করে তারা। আর সরকার নিজ অর্থায়নে সেতুর কাজ শুরু করে। এ বিষয়ে কানাডা আদালতে চলা একটি মামলার রায় প্রকাশ হয়েছে স্থানীয় সময় শুক্রবার। বাংলাদেশে এর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় পরদিন। এতে বলা হয়, পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ গালগপ্প।
পরদিন সংসদে বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশে যারা দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন তাদের তীব্র নিন্দা করা হয়।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘(২০০৮ সালের ডিসেম্বরের) নির্বাচনে জয়ের পর শেখ হাসিনা এগিয়ে যাচ্ছেন, পদ্মা সেতু তৈরি হওয়ার সব প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে, প্রধানমন্ত্রী তখন বিদেশে ছিলেন, কমনওয়েলথের একটি বৈঠেকে যোগ দিয়েছিলেন। সে সময় ঢাকার বিভিন্ন গণমাধ্যমে নরওয়ের একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশিত হয়। যেটিতে ড. ইউনূসের বিভিন্ন দুর্নীতি, অনৈতিক তথ্য প্রকাশিত হয়।’
দীপু মনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেটি নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটে। একটি গণতান্ত্রিক সরকার একটি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল জনগণের সরকারপ্রধান হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর এই অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখবার জন্য নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি কমিটি করে দেন। …পদ্মা সেতুর সাগা শুরু হয় এর পরপর।’
দীপু মনি বলেন, ‘যখন এই কমিটি করা হয়, তার পরপরই বিশ্বব্যাংকের স্থানীয় প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্পস্টেইন মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে একটি পত্র লিখেন, যার একটি কটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দেয়া হয়। …’
চিঠিতে বলা হয়েছিল, ড. ইউনূস এর ব্যাপারে তদন্ত বন্ধ করতে হবে। প্রচ্ছন্ন হুমকি ছিল এই পত্রে। বলা হয়েছিল যদি এই তদন্ত বন্ধ করা না হয়, তাহলে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সহযোগিতা হয়ত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
দীপু মনি বলেন, ‘তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমার সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দেখা করেন। এরপর মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি এসে দেখা করেন, তিনি একাধিকবার ফোনে আমার সঙ্গে দেখা করেন। তাদের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় আসে। তাদের কথায় অন্য যা কিছু ছিল না কেন বারবার এক কথা এসেছে, গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কিত যা কিছু তদন্ত সব কিছু বন্ধ করতে হবে, তাকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরানো যাবে না। কোনোভাবেই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। তখন আর প্রচ্ছন্ন থাকেনি, তখন সরাসরি বলা হয়, যদি সেটা করা না হয়, তাহলে পদ্মাসেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়া হবে।’
দীপু মনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকার করেছিলেন পদ্মা সেতু করবেন। তিনি যেহেতু কথা দিয়ে কথা রাখেন, তাকে সেটা করতেই হবে। সে সময় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে আইনের শাসনকে যেমন সমুন্নত রাখার দরকার ছিল, একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রখার জন্য, যে কোনো ধরনের অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার না করাও আমাদের কাছে প্রয়োজন ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন। তিনি দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে দেশের সম্মান, মানুষের সম্মান, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের সার্বভৌমত্ব তাকে কোনো রাষ্ট্রের অনৈতিক চাপের কাছে ছোট হতে দেননি।’
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাংলাদেশ কারও দয়ার দানে পাওয়া নয়। আমরা ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে প্রায় ছয় লক্ষ মা বোনের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই দেশ পেয়েছি। এই দেশকে আমরা কোনো রাষ্ট্রের, কোনো ব্যক্তির, কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে অন্য কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পর্কের কাছে আমাদের সম্মানকে মাথানত হতে দিতে পারি না।’
দীপু মনি বলেন, ‘নোবেলবিজয়ী ইউনূস আইন ভঙ্গ করে গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় ৫৪টি কোম্পানি করেছিলেন। তার সমস্ত কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে নোটিশ দিয়েছিল তিনি আর এমডি থাকতে পারেন না। কারণ গ্রামীণ ব্যাংক আইন অনুযায়ী ৬০ বছরের বেশি বয়স হয়ে গেলে কেউ এমডি থাকতে পারেন না। তিনি তার আইনি ও রাজনৈতিক পরামর্শকের পরামর্শে আদালতে গিয়েছিলেন। তিনি হেরে গিয়েছিলেন। এরপর তিনি আপিল করেছিলেন, সেখানেও তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। কারণ দেশে হোক, বিদেশে হোক, কোনো আদালতের পক্ষে তো ৭০ বছর বয়সী কারও বয়স কমিয়ে ৬০ বছর করার ক্ষমতা তো নেই। তিনি পদচ্যুত হন। এই রাগ, এই জেদ এবং এই যে তিনি ৫৪টি কোম্পানি করেছিলেন তার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য তিনি সারাবিশ্ব হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। সারা বিশ্বে শেখ হাসিনার সরকারকে হেয় করবার জন্য লবিস্ট নিয়োগ করেছেন, নানা জায়গায় কেম্পেইন চালিয়েছেন।’
দীপু মনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার পেছনে মূল লক্ষ্য ছিল শেখ যাদেরকে শেখ হাসিনার কাছের মানুষ মনে করা হয়েছে, তাদেরকে ধরার জন্য, তাদেরও হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়।’ দীপু মনি জানান, শেখ হাসিনার অন্যতম আইনজীবী তার স্বামীকেও সে সময় হেয় করার চেষ্টা করা হয়। তিনি বলেন, ‘সে সময় আমাকে এবং তাকে নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাপা হয়। আমি তখন দেশের দায়িত্বশীল পদে ছিলাম। তখন সব কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।’
‘কোনো কিছু যাচাই বাছাই ছাড়াই সমালোচনা উচিত নয়’
দীপু মনি বলেন, ‘যে কোনো বিষয় যখনই হঠাৎ করে একটা বিষয় উত্থাপিত হয়, সবাই সেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর যদি মনে করা হয় এটিকে দিয়ে সরকারকে কোনোভাবে হেয় করা যায়, তাহলে সেটির জন্য সরকারের উৎসাহ উদ্দীপনা আরও বেশি থাকে।’
দীপু মনি বলেন, ‘ভেবে দেখতে হবে, আমরা কোনো কিছু পেলেই সেটা তথ্যনির্ভর কি না, সেটি বস্তুনিষ্ঠ কি না সেটি ভালোভাবে খতিয়ে না দেখে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যে কারো চরিত্রহনন করবো কি না।’
সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যমের ভূমিকাও দেখতে হবে। গণমাধ্যমের একাংশ যেভাবে বড় বড় হেডলাইন করেছে, তারা যে ধরনের ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে, তাদের এই মামলার এই রিপোর্ট কেন এত ছোট হয়। তাহলে তারা এই দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে।’
























