পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে আজ মঙ্গলবার। দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আজ ইউরেনিয়াম লোডিং করতে যাচ্ছে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। পারমাণবিক জ¦ালানি ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পা দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর ফলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। আশা করা হচ্ছে, আগামী জুলাইয়ের শেষ কিংবা আগস্টের মধ্যে আংশিক
উৎপাদন শুরু করবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। পর্যায়ক্রমে আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদনে যাবে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশের যে বিদ্যুৎ সংকট, সেখানে এ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) ফুয়েল লোডিং করার পর আমরা আশা করছি পর্যায়ক্রমে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে প্রথম ইউনিটের পুরো ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তাতে বিদ্যুতের সংকট অনেক কমে আসবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, ফুয়েল লোডিং অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করবেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং একই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন (ধারণকৃত) আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আজ বেলা ৩টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে ৪টার মধ্যেই আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রূপপুর কর্তৃপক্ষ ফুয়েল লোডের কারিগরি বিষয়ে মনোযোগ দেবে।
বিজ্ঞান সচিব আশা প্রকাশ করে বলেন, জুলাইয়ের শেষে অথবা আগস্টের শুরুর দিকেই প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সেই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে। এর মাধ্যমেই ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিংয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাসান জানান, রিয়্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগবে। তিনি বলেন, জ্বালানি লোড করার পর আমরা চূড়ান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ রিপোর্ট তৈরির জন্য বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাব। তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত কারিগরি এবং সূক্ষ্ম বিষয়।
প্রসঙ্গত, দফায় দফায় সময় পিছিয়ে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে পুরোদমে বিদ্যুৎ পাওয়া শুরু হলে তেলভিত্তিক এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা অনেকটা কমবে বলে আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছিল এপ্রিলের ৭ তারিখে ফুয়েল লোড করা হবে। এর পর পর্যায়ক্রমে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। পর্যায়ক্রমে মে মাসে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে বিদ্যুৎ গ্রিডে। এ সময় ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ৩৩ শতাংশ উৎপাদন বাড়িয়ে ৩৭৫ মেগাওয়াট এবং ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৪৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। ক্রমান্বয়ে আগস্ট মাসে সক্ষমতার ৫৮ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে ৭৮৭ মেগাওয়াট, সেপ্টেম্বরে ৮৬ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৯৯১ মেগাওয়াট এবং নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্থাৎ ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। তবে লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতায় ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম প্রায় ২১ দিন পিছিয়ে ২৮ এপ্রিল হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় এক মাস পেছাবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষামূলক চালুর সময় কেন্দ্রটি সরাসরি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হয় না। ফলে জুন-জুলাই মাসে উৎপাদন শুরুর পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়ানো হবে।
উল্লেখ্য, প্রায় এক বছর যাবৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও জাতীয় গ্রিডে উৎপাদনে আসতে পারছিল না। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেছেন, গত বছরের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদনে আসার লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করে বাংলাদেশ। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অনাগ্রহ এবং ভু-রাজনৈতিক কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে নিয়ে আসার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি রাশিয়ান প্রতিষ্ঠান। এ কর্মকর্তারা বলেন, রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একটি রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষায় ছিল।
প্রসঙ্গত, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে না আসায় বাংলাদেশ এবং রাশিয়া উভয় দেশই আর্থিকভাবে ক্ষতির মধ্যে পড়ছে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রূপপুর প্রকল্পটি নির্মাণ শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই পুরোপুরি ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদে পড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রকল্পটি রাশিয়ান অর্থে বাস্তবায়ন এবং ভারতের সংশ্লিষ্টতা থাকায় ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞায় বাধাগ্রস্ত হয়। তবে নানা বাধা পেরিয়েছে এখন প্রকল্পটি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েছে। এতকিছুর পর কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পারলেই সফলতা আসবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট প্রথমে ২০২১ উৎপাদনে আসার পরিকল্পনা ছিল। দ্বিতীয় ইউনিট ২০২২ সালে। পরে প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসার কথা ছিল। কয়েক দফা সময়সীমা পিছিয়ে সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময় নির্ধারণ করা হয়। এখন চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরোদমে উৎপাদনে আসবে বলে জানানো হয়েছে। ফলে পরিকল্পনা থেকে অন্তত চার বছর পিছিয়ে গেছে সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট মিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রসাটম। বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাব সমন্বয় করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৪.১৭ কোটি টাকার প্রস্তাব গত ২৭ নভেন্বর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। মূল প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, লক্ষ্য অনুযায়ী উৎপাদন আসতে না পারার কারণে বেড়েছে ঋণের সুদ। চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও খরচ বাড়াতে পারবে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে ডলারের বিনিময় হার বাড়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ২৩.১৫ শতাংশ বেশি। ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও বেড়েছে। মূল প্রস্তাবে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে বাস্তবায়ন শুরু করা প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এখন এ মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা যায়।
পাবনা প্রতিনিধি জানান, জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হতে যাওয়ায় আনন্দিত ও আশাবাদী এ অঞ্চলের মানুষ। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হতে সময় লাগবে প্রায় ৪৫ দিন। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। এক বছর পর পূর্ণ সক্ষমতায় ইউনিটটি চালু হলে সম্ভব হবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন।
পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর মনে করেন, এতদিন মূল কাজ ছিল অবকাঠামো নির্মাণ, এখন ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তার মতে, জ্বালানি লোড করার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো চেইন রিঅ্যাকশন বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু করা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত যাত্রা।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. প্রীতম কুমার দাসের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য পরমাণু বিদ্যুৎ অপরিহার্য। তবে স্পর্শকাতর প্রকল্প হওয়ায় এর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও নিয়মিত মনিটরিংয়ে শতভাগ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।



























