দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ রাজস্ব আদায়ের বাইরে রয়েছে। নিবন্ধন থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দিচ্ছে না। আবার রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ কোনো ভ্যাট পরিশোধ না দেখিয়ে শূন্য রিটার্ন দিচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত থাকলেও সেখান থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক গোয়েন্দা পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার ২৩২টি। এর মধ্যে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৭৪৫টি প্রতিষ্ঠান হয় কোনো রিটার্ন জমা দেয়নি, নয়তো শূন্য ভ্যাট দেখিয়ে রিটার্ন দিয়েছে। অর্থাৎ মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ৮৯ দশমিক ৩৪ শতাংশের কাছ থেকে ওই মাসে কোনো ভ্যাট প্রদর্শিত হয়নি। বিপরীতে মাত্র ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রিটার্নে ভ্যাট দেখিয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, জুলাই মাসে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৪টি প্রতিষ্ঠান কোনো রিটার্ন জমা দেয়নি। মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এ হার ৬৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ওই মাসে রিটার্ন জমা দিয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৮৫৮টি প্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭১টি প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। অর্থাৎ রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো ভ্যাট প্রদর্শন করেনি।
সব মিলিয়ে জুলাই মাসে মাত্র ৮৮ হাজার ৪৮৭টি প্রতিষ্ঠান রিটার্নে ভ্যাট দেখিয়েছে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভ্যাট প্রদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানের এ সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে ভ্যাট গোয়েন্দার ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের রিটার্ন জমা না দেওয়া কিংবা শূন্য রিটার্ন দেওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। তবে শূন্য রিটার্ন জমা দিলেই কোনো প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে, এমনটি বলা যাবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকলে কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে করযোগ্য লেনদেন না হলে শূন্য রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা করেও রিটার্ন না দেওয়া বা প্রকৃত লেনদেন গোপন করে শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়া অনিয়মের পর্যায়ে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়মিত যাচাই না করলে শুধু ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে নিবন্ধন হালনাগাদ, রিটার্ন জমা না দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের লেনদেন নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।
ভ্যাট গোয়েন্দার প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জুলাই মাসে দেশে মোট ভ্যাট আদায় হয়েছে ৩ হাজার ২৬৬ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ৩৩৭টি প্রতিষ্ঠান থেকেই এসেছে ২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ভ্যাট আদায়ের প্রায় ৮০ দশমিক ৬৭ শতাংশ দিয়েছে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, বাকি ৮ লাখ ২৯ হাজার ৮৯৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট জমা হয়েছে প্রায় ৬৩১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানসংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলে প্রতিটির বিপরীতে গড় জমার পরিমাণ দাঁড়ায় মাসে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ টাকা। তবে এ হিসাবের মধ্যে রিটার্ন জমা না দেওয়া ও শূন্য রিটার্ন দেওয়া প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তাই এটি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ভ্যাট পরিশোধের পরিমাণ নির্দেশ করে না।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেশের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ভ্যাট) পর্যায়েও রিটার্ন না দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। সবচেয়ে বড় করদাতা হিসেবে বিবেচিত এ ইউনিটে নিবন্ধিত ১১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জুলাই মাসে রিটার্ন জমা দিয়েছে ৮৭টি। বাকি ২৪টি প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দেয়নি।
অথচ ওই মাসে এলটিইউ-ভ্যাট কমিশনারেটের মাধ্যমে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায় হয়েছে। বড় করদাতা ইউনিটের একাংশের রিটার্ন জমা না দেওয়ার বিষয়টি এ খাতের তদারকি ও অনুসরণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ কমিশনারেটের অধীনে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩৫টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও জুলাই মাসে রিটার্ন জমা দিয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার ৮০৫টি। অর্থাৎ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৪ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে। ওই মাসে কমিশনারেটটির ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৯১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৯০ হাজার ১১২টি। জুলাই মাসে এ কমিশনারেটের ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৯ হাজার ৪৬৬টি শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। অধিদপ্তরের পর্যালোচনা অনুযায়ী, রিটার্নদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার হার প্রায় ৭০ শতাংশ।
পর্যটননির্ভর কক্সবাজারের ভ্যাট আদায়ের চিত্রও উল্লেখযোগ্য। জেলাটিতে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৩৫টি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৭ কোটি টাকার কিছু বেশি। ওই মাসে ১ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট দিয়েছে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৬৪ শতাংশ শূন্য রিটার্ন দিয়েছে।
রাজশাহী, রংপুর ও যশোর ভ্যাট কমিশনারেটেও শূন্য রিটার্নের হার বেশি। এসব এলাকায় রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশ কোনো ভ্যাট প্রদর্শন করেনি।
ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ রিটার্ন জমা না দেওয়া কিংবা শূন্য রিটার্ন দেওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা অনুসন্ধানের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এসব প্রতিষ্ঠানের কতটি বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনা করছে, কতটি নিষ্ক্রিয় এবং কতটির নিবন্ধন হালনাগাদ বা বাতিল করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে প্রকৃত রাজস্ব সক্ষমতা নিরূপণ কঠিন।
এ পরিস্থিতিতে ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেন পুরো বিষয়টি অবহিত করে এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায়ের প্রধান তিনটি খাত-মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে ভ্যাট আদায়ে। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে চলতি অর্থবছর থেকে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান চালু করেছিল এনবিআর। এর আগে প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। তবে ব্যবসায়ীদের আপত্তি এবং ভ্যাট আদায়ে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় গত সেপ্টেম্বর থেকে আবারও মাসভিত্তিক রিটার্ন জমার নিয়মে ফিরে এসেছে সংস্থাটি।

























