চলমান জালানি তেলের সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে ফের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল। গতকাল সোমবার এই সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য একটি মুলতবি প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আবরও বলা হয়েছে, দেশে জ¦ালানি তেলের কোনো সংকট নেই। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান সংসদে উপস্থতি ছিলেন না।
মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার শুরুতেই বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ প্রত্যাশা করছে এই সংসদে জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা হবে। এটি এখন দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। কিন্তু আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনা করতে পারছি না। এটা কি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য নয়? পত্রিকার রিপোর্ট বা সামাজিক মাধ্যমের বাইরে আমি নিজে বাস্তবে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছি এবং দেখেছি সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা অসন্তোষ বিরাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, সংসদের প্রতিটি সেকেন্ড ব্যয় হচ্ছে জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। এই প্রতিষ্ঠান জনগণের সম্পদ দিয়ে গড়া। আমরা এখানে নিজেদের প্রয়োজনে আসিনি, জনগণ তাদের প্রয়োজনে আমাদের পাঠিয়েছে। যদি জনগণের এই চরম দুর্ভোগের সময় তাদের কথাগুলো সংসদে বলতে না পারি, তবে এখানে থাকার কোনো সার্থকতা নেই।
সরকারের পরিসংখ্যান ও বক্তব্যের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, আমি বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাইনি। একদিকে সংসদে বলা হচ্ছে তেলের কোনো সংকট নাই, অন্যদিকে সংসদের বাইরে তেলের জন্য মানুষ হাহাকার করছে। সংকট আছে বলেই আজ হাইকোর্টের মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভার্চুয়ালি কাজ করতে হচ্ছে। সংকট না থাকলে এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো?
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বুঝি এটি একটি গ্লোবাল ম্যাটার এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সমস্যা হচ্ছে। আমরা বারবার বলছি সবাই মিলে কন্ট্রিবিউট করতে চাই। পরিস্থিতি সহজ করার জন্য মতামত দিতে চাই। কিন্তু সব দায়িত্ব যদি শুধু সরকারি দলই পালন করে, তবে আমরা নাগরিক বা জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়বদ্ধতা পালন করব কীভাবে?
তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, এই সংকট এই মুহূর্তের গুরুতর সমস্যা। কারণ গোটা অর্থনীতির চাকাই নির্ভর করে পাওয়ার বা শক্তির ওপর, যার কাঁচামাল হলো এই জ্বালানি। তাই দায়সারাভাবে নিষ্পত্তি না করে, মাননীয় সংসদ নেতার উপস্থিতিতে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য সময় বরাদ্দ করা হোক।
জ্বালানি সংকট নেই, পাচার ও অপচয় রোধে মূল্যবৃদ্ধি, বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন, দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই। মূলত পাচার ও অপচয় রোধ করে জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আনতেই সরকারের পক্ষ থেকে কিঞ্চিৎ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব সাধারণত বিরোধী দল থেকে আনা হয়, ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারের কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য। তবে আমাদের বর্তমান সংসদীয় সংস্কৃতিতে এই সেশনেই ইতোমধ্যে দুটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা ইতিহাসে অনন্য নজির। এই সেশনের মধ্যেই আরও একটি মুলতবি প্রস্তাব এলাও করলে সেটি ভবিষ্যৎ সেশনগুলোর জন্য একটি নেতিবাচক প্রথা বা প্রিসিডেন্ড তৈরি করবে।
জ্বালানির দাম বাড়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় জনগণের সুবিধার্থে আমরা সহনীয় মাত্রা পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক পর্যায়ে যখন আমাদের ন্যাশনাল ইকোনমি আর অ্যাফোর্ড করতে পারছিল না, এ জন্য আমরা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। জ্বালানির দাম কম থাকলে এটি অন্যভাবে অপচয় হওয়ার বা পাচার হওয়ার প্রবণতা থাকে। সেই পাচার বন্ধ করতে এবং একটি ডিসিপ্লিনের মধ্যে আনতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাব প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, মাননীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইতোমধ্যে ৩শ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন যে আমাদের দেশে তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই। বিষয়টি এখন জাতির কাছে পরিষ্কার। সুতরাং সংসদ মুলতবি রেখে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, সংসদ মুলতবি না করে ৬৮ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হতে পারে। মাননীয় স্পিকারের কাছে অনুরোধ থাকবে তিনি যেন বিরোধীদলীয় নেতাকে এই বিধিতে নোটিশ দেওয়ার সুযোগ দেন। মাননীয় সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আমরা সেখানে গঠনমূলক আলোচনা করতে পারি।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে রেমিট্যান্সে : বাণিজ্যমন্ত্রী : মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর চাপ পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুলের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলার শঙ্কা রয়েছে এবং বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য, চামড়াজাত ইত্যাদি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের বাজারে রপ্তানি হয়ে থাকে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে চলমান অস্থিরতা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রয়েছে; যা আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বীমা খরচ বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি হ্রাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে রপ্তানির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। এটি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির শঙ্কা রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, চলমান সংকট মোকাবিলায় সামগ্রিক পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় অনেকগুলো পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি লজিস্টিক ব্যয় কমানো, যুদ্ধসংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরের দেশগুলোয় বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ‘মূল্যস্ফীতি সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না’। ‘মূল্যস্ফীতিটা সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না কেন, এটা একটু বোঝা দরকার। সারা পৃথিবীতে জ্বালানির মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, সেটা অত্যন্ত সামান্য।’
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে তেলের দাম ভিন্ন হয়, নিজস্ব ট্যাক্সের কারণে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে অনেক অঙ্গরাজ্যে প্রতি গ্যালনের দাম ২ ডলার ৮০ সেন্ট বা ৭০ সেন্ট ছিল, সেটি এখন ৫ ডলার ছাড়িয়েছে। আশপাশের যেকোনো দেশ অথবা বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় যেকোনো অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে তুলনামূলকভাবে জ্বালানি পণ্যের মূল্য প্রতিটি দেশে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক দেশে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়। এটার জন্য সরকারের আলাদা পদক্ষেপ নিতে হয় না।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এখানে যে বৃদ্ধিটা হয়েছে, ডিজেলের ক্ষেত্রে ১০০ টাকার ডিজেলকে আমরা ১১৫ টাকা করেছি। আমি শুধু বোঝার জন্য বলছি, একটা শিল্প কারখানায় তাদের যে কস্ট অব প্রোডাকশন (উৎপাদন খরচ) থাকে, তার মধ্যে ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকে জ্বালানির মূল্য। সেই ৭ থেকে ৮ শতাংশকে যদি ১০০ পারসেন্ট ধরি, তার ১৫ শতাংশ ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পায়, তবে তা মোট খরচে খুব সামান্য প্রভাব ফেলে।’
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, একইভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে, একটি বাস ২০০ কিলোমিটার চলার জন্য কমবেশি ২৫ থেকে ৩০ লিটার ডিজেল লাগে। এই ৩০ লিটার ডিজেলের ক্ষেত্রে সাড়ে চারশ টাকার মতো মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ট্রাকের পণ্য পরিবহনের জন্য হিসাব করা হলে বাড়তি মূল্যের ভার পড়বে ১০ হাজার কেজি পণ্যের ওপর।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তার মানে এমনি শুনলেই মনে হয় যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমরা যদি পরিবাহিত পণ্যের ইউনিটের হিসাব করি, তাহলে সেই বৃদ্ধিটা মূল্যস্ফীতির জন্য ওই রকম উদ্দীপক নয়। এটা ঠিক, আপনি অর্থনীতিকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন না, যেখানে ফান্ডামেন্টাল ব্যালেন্সটা ইমব্যালেন্সড (মৌলিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া) হয়ে যায়। সে জন্য পৃথিবীর সব দেশ যে নীতি নিয়েছে, আমরা সেই নীতি মডেস্টলি নিয়েছি এবং খুবই একটা মডারেট মূল্যবৃদ্ধি করেছি।
























