ঢাকা ১০:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: খুলতে পারে বন্ধ শ্রমবাজারের দুয়ার

মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: খুলতে পারে বন্ধ শ্রমবাজারের দুয়ার

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আগামী ২১ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুর যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর।

নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে গত তিন মাস ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছিল। আঞ্চলিক প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়াকে প্রথম সফরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২১ থেকে ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফরে যাবেন। তবে তিনি কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি বেইজিং যাবেন নাকি ঢাকা হয়ে যাবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সফরে অভিবাসন ইস্যুটি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে। ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে বন্ধ থাকা জনশক্তি রপ্তানির জট এবার খুলতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত বড় কোনো অর্জনকে সামনে রেখেই শীর্ষ পর্যায়ের এমন সফর নির্ধারিত হয়। আর এবারের সফরের অন্যতম মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা।

সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে শ্রমবাজারের বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। গত এপ্রিলে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফর করে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা সেরে রেখেছেন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার খবরের পাশাপাশি অতীতে কর্মী পাঠানোর নামে গড়ে ওঠা বিতর্কিত সিন্ডিকেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৮, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে দফায় দফায় বাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ত্রুটি দায়ী ছিল বলে মনে করা হয়। বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান চুক্তি সংশোধন না করলে পুরোনো সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করে বলেছেন, কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বরদাশত করা হবে না এবং এ বিষয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।

২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মী পাঠানোর জন্য ১০টি কঠোর শর্তসহ এজেন্সির তালিকা চেয়েছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ১০ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী অফিসের মতো শর্তগুলো শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের ২ হাজার ৫০০ বৈধ লাইসেন্সধারী এজেন্সির মধ্য থেকে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়া সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, বাজার খোলার পাশাপাশি তা যেন টেকসই হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। আগের চুক্তির ফাঁকফোকরগুলো যাচাই-বাছাই করে নতুন করে প্রক্রিয়াটি সাজানো প্রয়োজন।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে প্রথম মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী সেখানে যান।

আসন্ন সফরে কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শ্রমবাজারের পাশাপাশি বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ, সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, জ্বালানি, উচ্চশিক্ষা, কৃষি, হালাল খাদ্য, সুনীল অর্থনীতি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো এই বৈঠকে আলোচনায় স্থান পাবে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঢাকা সফর করেছিলেন এবং ২০২৫ সালের আগস্টে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফর করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ড. খলিলুরকে অভিনন্দন জানালেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: খুলতে পারে বন্ধ শ্রমবাজারের দুয়ার

আপডেট সময় : ১২:২৫:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আগামী ২১ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুর যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর।

নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে গত তিন মাস ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছিল। আঞ্চলিক প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়াকে প্রথম সফরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২১ থেকে ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফরে যাবেন। তবে তিনি কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি বেইজিং যাবেন নাকি ঢাকা হয়ে যাবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সফরে অভিবাসন ইস্যুটি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে। ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে বন্ধ থাকা জনশক্তি রপ্তানির জট এবার খুলতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত বড় কোনো অর্জনকে সামনে রেখেই শীর্ষ পর্যায়ের এমন সফর নির্ধারিত হয়। আর এবারের সফরের অন্যতম মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা।

সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে শ্রমবাজারের বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। গত এপ্রিলে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফর করে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা সেরে রেখেছেন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার খবরের পাশাপাশি অতীতে কর্মী পাঠানোর নামে গড়ে ওঠা বিতর্কিত সিন্ডিকেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৮, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে দফায় দফায় বাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ত্রুটি দায়ী ছিল বলে মনে করা হয়। বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান চুক্তি সংশোধন না করলে পুরোনো সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করে বলেছেন, কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বরদাশত করা হবে না এবং এ বিষয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।

২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মী পাঠানোর জন্য ১০টি কঠোর শর্তসহ এজেন্সির তালিকা চেয়েছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ১০ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী অফিসের মতো শর্তগুলো শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের ২ হাজার ৫০০ বৈধ লাইসেন্সধারী এজেন্সির মধ্য থেকে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়া সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, বাজার খোলার পাশাপাশি তা যেন টেকসই হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। আগের চুক্তির ফাঁকফোকরগুলো যাচাই-বাছাই করে নতুন করে প্রক্রিয়াটি সাজানো প্রয়োজন।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে প্রথম মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী সেখানে যান।

আসন্ন সফরে কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শ্রমবাজারের পাশাপাশি বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ, সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, জ্বালানি, উচ্চশিক্ষা, কৃষি, হালাল খাদ্য, সুনীল অর্থনীতি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো এই বৈঠকে আলোচনায় স্থান পাবে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঢাকা সফর করেছিলেন এবং ২০২৫ সালের আগস্টে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফর করেন।