ঢাকা ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে নতুন ঝুঁকিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে নতুন ঝুঁকিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানের ওপর বিমান হামলা আরও তীব্র করার পাশাপাশি সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অতীতে প্রবল সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও ইরানকে বিন্দুমাত্র টলানো যায়নি, ফলে ট্রাম্পের এই পুরোনো ও ব্যর্থ কৌশলের পুনরাবৃত্তি এবারও কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন ও অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, এক মাস আগে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে চাপে পড়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমানো এবং তেহরানকে আমেরিকার শর্ত মেনে আলোচনার টেবিলে ফেরানো।

যদিও এখনো পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়নি, তবু সংকট মেটানোর সম্ভাবনা দিন দিন কমে আসছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বেড়েছে এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

প্রতিশোধমূলক হামলা এখন টানা ষষ্ঠ দিন চলছে। ইরান স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা করে, তাহলে ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

মার্কিন গণমাধ্যম ও রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, সেতু, খার্গ দ্বীপের তেল রপ্তানি কেন্দ্র এবং গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ বলেন, নতুন করে হামলা বাড়ালেও ইরানের অবস্থান বদলানোর কোনো কারণ নেই। বরং এতে তারা আরও শক্ত অবস্থান নেবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক সমাধান চাইলেও ইরান শুধু সামরিক শক্তির ভাষাই বোঝে। তাই প্রণালিগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য তেহরানকে জবাবদিহি করতেই হবে।

অভ্যন্তরীণ চাপেও পড়েছেন ট্রাম্প। অন্তর্বর্তী চুক্তি ভেঙে যাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হাজারো প্রাণহানি, অর্থনৈতিক চাপ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জনপ্রিয়তা কমছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্থায়ী সমঝোতার আলোচনা এখন থেমে আছে। ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, ইরানে আটক এক মার্কিন নাগরিক মুক্তি পেয়েছেন, তবে ইরানের বিচার বিভাগ তা সরাসরি অস্বীকার করেছে।

হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, ইরানি জাহাজে হামলা ও নৌপথে উত্তেজনা চুক্তি লঙ্ঘন। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানি বন্দর অবরোধ এবং ইরানের তেল রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করেছে।

রয়টার্স বলছে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে বড় অভিযানের আগে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া।

ইরান অবশ্য সতর্ক করে দিয়েছে, হামলা আরও বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাদের হাতে এখনো যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে।

একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, তেহরান হুথি গোষ্ঠীকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ নতুন করে সংকটে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প আবারও আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, যত চাপই দেওয়া হোক, ইরানের নেতৃত্ব সহজে নতি স্বীকার করবে না। বরং হামলা বাড়লে তারাও আরও জোরালো পাল্টা জবাব দেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে নতুন ঝুঁকিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে নতুন ঝুঁকিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প

আপডেট সময় : ০৬:১৯:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

ইরানের ওপর বিমান হামলা আরও তীব্র করার পাশাপাশি সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অতীতে প্রবল সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও ইরানকে বিন্দুমাত্র টলানো যায়নি, ফলে ট্রাম্পের এই পুরোনো ও ব্যর্থ কৌশলের পুনরাবৃত্তি এবারও কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন ও অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, এক মাস আগে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে চাপে পড়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমানো এবং তেহরানকে আমেরিকার শর্ত মেনে আলোচনার টেবিলে ফেরানো।

যদিও এখনো পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়নি, তবু সংকট মেটানোর সম্ভাবনা দিন দিন কমে আসছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বেড়েছে এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

প্রতিশোধমূলক হামলা এখন টানা ষষ্ঠ দিন চলছে। ইরান স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা করে, তাহলে ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

মার্কিন গণমাধ্যম ও রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, সেতু, খার্গ দ্বীপের তেল রপ্তানি কেন্দ্র এবং গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ বলেন, নতুন করে হামলা বাড়ালেও ইরানের অবস্থান বদলানোর কোনো কারণ নেই। বরং এতে তারা আরও শক্ত অবস্থান নেবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক সমাধান চাইলেও ইরান শুধু সামরিক শক্তির ভাষাই বোঝে। তাই প্রণালিগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য তেহরানকে জবাবদিহি করতেই হবে।

অভ্যন্তরীণ চাপেও পড়েছেন ট্রাম্প। অন্তর্বর্তী চুক্তি ভেঙে যাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হাজারো প্রাণহানি, অর্থনৈতিক চাপ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জনপ্রিয়তা কমছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্থায়ী সমঝোতার আলোচনা এখন থেমে আছে। ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, ইরানে আটক এক মার্কিন নাগরিক মুক্তি পেয়েছেন, তবে ইরানের বিচার বিভাগ তা সরাসরি অস্বীকার করেছে।

হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, ইরানি জাহাজে হামলা ও নৌপথে উত্তেজনা চুক্তি লঙ্ঘন। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানি বন্দর অবরোধ এবং ইরানের তেল রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করেছে।

রয়টার্স বলছে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে বড় অভিযানের আগে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া।

ইরান অবশ্য সতর্ক করে দিয়েছে, হামলা আরও বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাদের হাতে এখনো যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে।

একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, তেহরান হুথি গোষ্ঠীকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ নতুন করে সংকটে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প আবারও আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, যত চাপই দেওয়া হোক, ইরানের নেতৃত্ব সহজে নতি স্বীকার করবে না। বরং হামলা বাড়লে তারাও আরও জোরালো পাল্টা জবাব দেবে।