২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ফুটবলবিশ্বের অন্যতম দুই প্রধান তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি দুজনেই নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন। উভয়েরই বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল ২০০৬ সালে জার্মানিতে। এরপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই তারা নিজেদের আলো ছড়িয়েছেন। ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে এটাই সম্ভবত শেষ উপস্থিতি হতে যাচ্ছে মেসি-রোনালদোর। তাদের বিদায়ী আসরে রঙ ছড়াতে পারেন বেশকিছু উদীয়মান ফুটবলার।
রোনালদোর বয়স এখন ৪১, আর মেসি আগামী ২৪ জুন ৩৯ বছরে পা দেবেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের। একইসঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও আলোচনায় থাকবে– কারা হবেন আগামী দিনের তারকা, যারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু দখল করবেন? সেই সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের ওপরই আলো ফেলা যাক–
তুরস্ক সর্বশেষ যখন বিশ্বকাপে খেলেছিল, তখন কেনান ইলদিজের জন্মই হয়নি। দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা তুরস্কের কোটি সমর্থকের প্রত্যাশার বড় অংশ এখন এই তরুণ তারকার কাঁধে। জার্মানিতে জন্ম নেওয়া ইলদিজ ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে জুভেন্তাসের হয়ে কোপা ইতালিয়া জিতেছেন এবং পরের মৌসুমে জায়গা করে নিয়েছেন সিরি ‘আ’র বর্ষসেরা একাদশে।
আক্রমণভাগে মিডফিল্ডার কিংবা উইঙ্গার– দুই ভূমিকাতেই খেলতে পারেন ইলদিজ। ২১ বছর বয়সী এই ফুটবলারকে তুরস্কের আক্রমণভাগের অন্যতম রোমাঞ্চকর প্রতিভা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সতীর্থ আর্দা গুলারের সঙ্গে আলোর রেখাটা ভাগাভাগি করলেও এবার বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব পরিচয়ে উজ্জ্বল হতে চাইবেন ইলদিজ।
অনেকেই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন ২১ বছর বয়সী এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার নিকো পাজকে। ইতালিয়ান সিরি ‘আ’র সদ্য সমাপ্ত কোমোর হয়ে ১২ গোল ও ৭ অ্যাসিস্ট করেছেন। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ক্লাবটি দ্বিতীয় বিভাগে খেলার মাত্র দুই মৌসুম পর প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে উঠেছে। আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও নিকো প্রয়োজনে নিচে নেমে কিংবা সামনে উঠে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন সমানভাবে। কোমোর কোচ সেস্ক ফ্যাব্রেগাসও তার এই বহুমুখী সামর্থ্যের প্রশংসা করেছেন।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের নতুন রত্ন রায়ান। গত মার্চে ১৯ বছর বয়সী এই উইঙ্গার প্রথমবার কার্লো আনচেলত্তির ডাকে জাতীয় দলে যুক্ত হয়েছিলেন, এবার চোটগ্রস্ত তরুণ সেনসেশন এস্তেভাওয়ের অনুপস্থিতি তাকে বিশ্বকাপ দলেও জায়গা করে দিয়েছে। বিশ্বকাপ-পূর্ব প্রস্তুতি ম্যাচে পানামার বিপক্ষে ব্রাজিলের ৬-২ গোলের জয়ে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটি করেছেন রায়ান।
সাবেক কোচ ফার্নান্দো দিনিজের আস্থায় গত বছর ভাস্কো দা গামায় দুর্দান্ত মৌসুম কাটান তিনি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তার ২০ গোলের সুবাদে ক্লাবটি কোপা দো ব্রাজিলের ফাইনালে ওঠে। যার পুরস্কার হিসেবে চলতি বছর তিনি ইংলিশ ক্লাব বোর্নমাউথে যোগ দেন এবং দ্রুতই মানিয়ে নেন ইংলিশ ফুটবলের সঙ্গে। প্রিমিয়ার লিগের ১৫ ম্যাচে ৫ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করে রায়ান বোর্নমাউথকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় তুলতে ভূমিকা রেখেছেন।
যে বয়সে পড়াশোনায় মনোযোগী থাকার কথা, সেই বয়সেই মেক্সিকান সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠেন গিলবার্তো মোরা। ২০২৪ সালে তিজুয়ানার এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেক্সিকোর শীর্ষ লিগে গোল করে ইতিহাস গড়েন। এর আগে তিনি ক্লাবটির সর্বকনিষ্ঠ অভিষিক্ত খেলোয়াড়ও হন। পাঁচ মাসের ব্যবধানে মেক্সিকো জাতীয় দলে ডাক এবং ১৬ বছর ৯ মাস ১৪ দিন বয়সে দেশটির সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক অভিষিক্ত খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন মোরা।
এই কিশোর আরও আলোচনায় আসেন গত বছরের জুলাইয়ে, যখন তিনি মেক্সিকোর হয়ে কনকাকাফ গোল্ড কাপ জিতে সিনিয়র আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টজয়ী সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হন। বল নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা এবং গোলের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর থাকা মোরা ২০২৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে খেলেছেন। এবার সিনিয়র বিশ্বমঞ্চে নিজের সামর্থ্য দেখাতে মুখিয়ে।
লেগানেস থেকে আরবি লাইপজিগে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ইউরোপীয় ফুটবলে ঝড় তুলেছেন ইয়ান দিয়োমান্দে। মাত্র এক বছরেরও কম সময়ে তার মূল্য ১০০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১১৬.৫ মিলিয়ন ডলার) নির্ধারণ করেছে জার্মান ক্লাবটি। দুর্দান্ত গতি, চমৎকার ড্রিবলিং এবং শারীরিক সক্ষমতার জন্য পরিচিত ১.৮ মিটার উচ্চতার এই উইঙ্গারের গোল করার ক্ষমতাও অসাধারণ।
১৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার সর্বশেষ বুন্দেসলিগায় ১২ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেছেন। যা লাইপজিগকে তৃতীয় স্থানে থেকে আগামী মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নিশ্চিত করায় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগা ‘রুকি অব দ্য সিজন’ পুরস্কার জয় ছাড়াও আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ও আইভরি কোস্টের বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দিয়োমান্দে।
ম্যানচেস্টার সিটির একাডেমি থেকে উঠে আসা নিকো ও’রাইলি ২০২৪-২৫ মৌসুমে সিনিয়র দলে অভিষেক করেন। সদ্য সমাপ্ত মৌসুমটা তার খারাপ কাটেনি। যেখানে পেপ গার্দিওলার অধীনে তিনি লেফট-ব্যাক ও আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার– দুই ভূমিকাতেই ছিলেন সফল। সবমিলিয়ে ৫০টির বেশি ম্যাচ খেলে নিকো ৯ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করেছেন।
২১ বছর বয়সী এই ফুটবলার দ্রুতই ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করেছেন। তার বহুমুখী দক্ষতা কোচ থমাস টুখেলের বিশ্বকাপ দলে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যখন ইংল্যান্ডকে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অনূর্ধ্ব-১৫ দল থেকে শুরু করে জার্মানির বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলা লেনার্ট কার্ল মার্চে প্রথমবারের মতো সিনিয়র জাতীয় দলে ডাক পান। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে অভিষেক মৌসুমেই সবমিলিয়ে ৯ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করে দ্রুতই বুন্দেসলিগার নতুন সেনসেশনে পরিণত হন কার্ল। ১৮ বছর বয়সী এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার প্রয়োজনে উইংয়েও খেলতে পারেন। দ্রুতগতি, কারিকুরি ও গোল করার দক্ষতা জুলিয়ান নাগালসম্যানের জার্মান স্কোয়াডে আকর্ষণীয় বিকল্পে পরিণত করেছে কার্লকে।
চারবার বুন্দেসলিগার ‘রুকি অব দ্য মান্থ’ নির্বাচিত হওয়া ১৯ বছর বয়সী লুকা ভুস্কোভিচ দ্রুতই লিগের অন্যতম সেরা তরুণ ডিফেন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। টটেনহ্যাম হটস্পার তার সঙ্গে চুক্তি করলেও তাৎক্ষণিকভাবে হামবুর্গারে ধারে পাঠানো হলে তিনি ২৭ ম্যাচে নিয়মিত খেলেছেন এবং সেন্টারব্যাক হওয়া সত্ত্বেও করেছেন ৬ গোল। সেট-পিসে দক্ষতার প্রমাণ দেওয়া ভুস্কোভিচকে ইউরোপের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সেন্টারব্যাকদের একজন মনে করা হচ্ছে। গুঞ্জন রয়েছে তার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখও।
জাপানের প্রতিভাবান বিশ্বকাপ দলে সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য ২০ বছর বয়সী স্ট্রাইকার কেইসুকে গোটো।
নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়ার পর এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। তাই কোচ হাজিমে মোরিয়াসু তাকে বিশ্বকাপ দলে রাখবেন কি না, তা নিয়ে নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না। তবে ক্লাব ফুটবলের সর্বশেষ মৌসুমে সব মিলিয়ে ১৩ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করা ১.৯১ মিটার (৬ ফুট ৩ ইঞ্চি) উচ্চতার এই স্ট্রাইকার জাপানের আক্রমণভাগে গোপন অস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন।
ইরাকের নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের অন্যতম প্রতিনিধি আলি জসিম নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে প্রস্তুত। দুই বছর আগে অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন ২২ বছর বয়সী এই ফুটবলার। এবার বিশ্বকাপে আসছেন সৌদি প্রো লিগে ভালো একটি মৌসুম কাটিয়ে। যেখানে ২৪ ম্যাচের মধ্যে ১৯টিতে ছিলেন শুরুর একাদশে। বাঁ-প্রান্তের উইঙ্গার হলেও তিনি আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার ও সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলতে পারেন। মৌসুমে তার গোল ৪টি। এর আগে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং প্যারিস অলিম্পিক ২০২৪-এ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে।






















