গাইবান্ধা জেলায় অপরাধপ্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। খুন, ধর্ষণ, চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটছে জেলাজুড়ে। এর পাশাপাশি ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনাও থেমে নেই।
চলতি বছরের প্রথমার্ধেই এই অপরাধচিত্র জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিশোধমূলক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
ছয় মাসে ২৪টি খুন, স্বজনের হাতেই স্বজন খুন বেশি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত জেলার সাত উপজেলায় ২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ৬টি ঘটনায় তুচ্ছ বিষয় নিয়ে স্বজনই স্বজনকে খুন করেছেন। এই প্রবণতা সামাজিক অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ দিক তুলে ধরছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ফুলছড়িতে ভাতিজার হাতে চাচা খুন, সাঘাটায় নাতির হাতে দাদি খুন, গোবিন্দগঞ্জে স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন এবং ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুনের ঘটনা। এ ছাড়া জমিজমার বিরোধেও একাধিক পরিবারে খুনোখুনি হয়েছে।
১২০ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার, জড়িত শিক্ষক-ইমামও
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ১২০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা দাঁড়িয়েছে ২৪৪টিতে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অপরাধে শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরাও জড়িয়ে পড়ছেন। গোবিন্দগঞ্জে এক মাদরাসা অধ্যক্ষ ছাত্রীকে ধর্ষণের পর ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ছাড়া একাধিক শিশু ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন উপজেলায়।
চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনাও উল্লেখযোগ্য
একই সময়ে চুরির ঘটনা ঘটেছে ১৯৫টি। মাদক-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে ১৯৬টি। সব মিলিয়ে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ৯৭৬টি।
সাঘাটায় এক নারীর কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদে দিন-দুপুরে নৌডাকাতির ঘটনায় লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন লুট হয়েছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে
খুন ও ধর্ষণের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। অন্তত চারটি ঘটনায় অভিযুক্তদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
সদর উপজেলার পিয়ারাপুরে খুনের প্রতিবাদে অভিযুক্তদের বাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর চালানো হয়। রামচন্দ্রপুরে এক কিশোরকে হত্যার পর অভিযুক্তদের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। সাঘাটার বোনারপাড়ায় আগুনে পুড়ে গেছে তিনটি নিরপরাধ পরিবারের ঘরবাড়িও, যারা মূল অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না।
বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া
গাইবান্ধার প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক রজতকান্তি বর্মন মনে করেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। তবে তিনি এ-ও বলেন, শুধু পুলিশকে দোষ দিলে চলবে না, সামাজিক অবক্ষয়ও একটি বড় কারণ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ মুত্তাজুল ইসলাম বলেন, কেউ নিজে অপরাধের বিচার করতে পারে না, এর জন্য আদালত রয়েছে। গাইবান্ধা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল কাইয়ুম আজাদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রশাসনিক স্থবিরতা ও সামাজিক অবক্ষয় একসঙ্গে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজীব জানান, পুলিশ প্রতিটি ঘটনা গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে এবং বিট পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।


























