ঢাকা ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বিচারে মানুষ মারছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাচ্ছে; একইসঙ্গে ইসরায়েলের দিকেও ছুড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। পাল্টাপাল্টি আক্রমণে যুদ্ধ ক্রমেই বিস্তৃত আকার নিচ্ছে এবং অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে। এরই মধ্যে আগামী সপ্তাহে ইরানের ওপর আরও কঠোর হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; আর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন-শিগগিরই তেহরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চসংখ্যক হামলা’ দেখা যেতে পারে। দুই সপ্তাহের সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ইরানে কঠোর হামলার হুমকি ট্রাম্পের মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের ওপর কঠোর আঘাত হানা হতে পারে। তিনি জানান, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে সামরিকভাবে রক্ষা করবে।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

এর আগে কেন্টাকিতে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যুদ্ধে এগিয়ে আছি, কিন্তু কাজ শেষ করতে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এ পর্যন্ত ইরানের প্রায় ১৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার তেহরানসহ ইরানের আকাশে আমেরিকার চালানো হামলার সংখ্যা সর্বোচ্চ হতে পারে।’ হেগসেথের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যেই এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আয়োজিত আল-কুদস দিবসের মিছিলের আশপাশে গতকাল একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার পর অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। ইরানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এ বার্ষিক সমাবেশে হাজারো মানুষ অংশ নেয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুরে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণে বিক্ষোভকারীতে পূর্ণ তেহরানের একটি স্কয়ার কেঁপে ওঠে। ফেরদৌসি স্কয়ারে বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে এর কিছুক্ষণ আগেই ইসরায়েল ওই এলাকায় হামলা চালানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মানুষকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিয়েছিল।

আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, তেহরানে বিক্ষোভকারীদের একটি সমাবেশস্থল থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে একটি বিমান হামলা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যেও তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমাবেশে অংশ নেয়।

তেহরানের সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে দেখা গেছে। এ ছাড়া সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। লারিজানি দাবি করেন, ভয় থেকেই ইসরায়েল কুদস দিবসে বোমা ফেলছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন না যে, ইরানিরা শক্তিশালী, সচেতন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি জাতি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানসহ খোররামাবাদ, ইসফাহান, গোলেস্তান, ইয়াজদ, মাশহাদ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাহেদান শহরে লাখো মানুষ পতাকা হাতে মিছিলে অংশ নিয়েছেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ও তার নিহত বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি দেখা গেছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবার ইরানে আল-কুদস দিবস পালন করা হয়। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এ দিবস ঘোষণা করেছিলেন।

ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বিবৃতি দিয়েছে। এএফপি জানায়, বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সরকারবিরোধী নতুন কোনো বিক্ষোভ দমনে গত জানুয়ারির চেয়েও ‘আরও কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ইরানে হওয়া বিক্ষোভে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। ইরান কর্তৃপক্ষ ওই বিক্ষোভের জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছিল। কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসার এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরান আবারও ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের বিরশেবায় একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং আরও হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সফর করে দেশটির জনগণের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে গুতেরেস বলেন, ‘আমি লেবাননের জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্য বৈরুতে সফরে এসেছি। এই যুদ্ধ তারা (লেবাননের জনগণ) চায়নি। তাদের টেনে আনা হয়েছে। জাতিসংঘ ও আমি লেবানন এবং এই অঞ্চলের যে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ প্রাপ্য, সেই লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালাতে কোনো ত্রুটি রাখব না।’

২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮৭ জন নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

সৌদি আরব জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া ৫৬টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এর আগে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৩টি ড্রোন ও পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার দাবি করেছিল দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এসব ড্রোন কোথা থেকে ছোড়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা হয়নি।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি এখন যুদ্ধ পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে। তুরস্কের পরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের অনুমতি নিয়ে তুর্কি মালিকানাধীন একটি জাহাজ ওই প্রণালি পার হয়েছে। বর্তমানে আরও ১৫টি জাহাজ পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট হাবেরতুর্ক-এর তথ্য অনুযায়ী তুর্কিমন্ত্রী উরালুগ্লু বলেন, ‘সেখানে [তুর্কি মালিকানাধীন] ১৫টি জাহাজ ছিল; আমরা একটি জাহাজের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছি।’ তিনি জানান, জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে গেছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্কুল, হাসপাতালসহ বেসামরিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান।

ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি কেসি- ১৩৫ জ¦ালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় ছয় মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে এবং আরও দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে এটি শত্রুপক্ষের হামলার ফল নয়।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার দাবি, মোজতবা খামেনি সম্ভবত জীবিত আছেন, তবে তিনি গুরুতর আহত হতে পারেন। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে জানা গেছে।

ফক্স নিউজের ‘দ্য ব্রায়ান কিলমিড শো’-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি সম্ভবত (জীবিত) আছেন। আমার ধারণা, তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, তবে কোনো না কোনোভাবে সম্ভবত বেঁচে আছেন।’ গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফক্স নিউজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ মন্তব্য প্রকাশ করে।

মোজতবা খামেনি তার প্রথম বক্তব্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার অঙ্গীকার করেন। একইসঙ্গে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার আহ্বান জানান। অন্যথায় সেসব ঘাঁটিতে ইরান হামলা চালাবে বলে হুশিয়ারি দেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আকাশে একটি লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করার পর তার ধ্বংসাবশেষ শহরের একটি ভবনের সামনে পড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়।

এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিখ্যাত বুর্জ আল আরব হোটেল এলাকার দিকেও।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে রাশিয়ার তেল বিক্রির ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ২ লাখ ডলার সহায়তা ঘোষণা করেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

নির্বিচারে মানুষ মারছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

আপডেট সময় : ১১:০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাচ্ছে; একইসঙ্গে ইসরায়েলের দিকেও ছুড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। পাল্টাপাল্টি আক্রমণে যুদ্ধ ক্রমেই বিস্তৃত আকার নিচ্ছে এবং অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে। এরই মধ্যে আগামী সপ্তাহে ইরানের ওপর আরও কঠোর হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; আর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন-শিগগিরই তেহরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চসংখ্যক হামলা’ দেখা যেতে পারে। দুই সপ্তাহের সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ইরানে কঠোর হামলার হুমকি ট্রাম্পের মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের ওপর কঠোর আঘাত হানা হতে পারে। তিনি জানান, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে সামরিকভাবে রক্ষা করবে।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

এর আগে কেন্টাকিতে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যুদ্ধে এগিয়ে আছি, কিন্তু কাজ শেষ করতে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এ পর্যন্ত ইরানের প্রায় ১৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার তেহরানসহ ইরানের আকাশে আমেরিকার চালানো হামলার সংখ্যা সর্বোচ্চ হতে পারে।’ হেগসেথের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যেই এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আয়োজিত আল-কুদস দিবসের মিছিলের আশপাশে গতকাল একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার পর অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। ইরানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এ বার্ষিক সমাবেশে হাজারো মানুষ অংশ নেয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুরে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণে বিক্ষোভকারীতে পূর্ণ তেহরানের একটি স্কয়ার কেঁপে ওঠে। ফেরদৌসি স্কয়ারে বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে এর কিছুক্ষণ আগেই ইসরায়েল ওই এলাকায় হামলা চালানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মানুষকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিয়েছিল।

আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, তেহরানে বিক্ষোভকারীদের একটি সমাবেশস্থল থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে একটি বিমান হামলা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যেও তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমাবেশে অংশ নেয়।

তেহরানের সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে দেখা গেছে। এ ছাড়া সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। লারিজানি দাবি করেন, ভয় থেকেই ইসরায়েল কুদস দিবসে বোমা ফেলছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন না যে, ইরানিরা শক্তিশালী, সচেতন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি জাতি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানসহ খোররামাবাদ, ইসফাহান, গোলেস্তান, ইয়াজদ, মাশহাদ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাহেদান শহরে লাখো মানুষ পতাকা হাতে মিছিলে অংশ নিয়েছেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ও তার নিহত বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি দেখা গেছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবার ইরানে আল-কুদস দিবস পালন করা হয়। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এ দিবস ঘোষণা করেছিলেন।

ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বিবৃতি দিয়েছে। এএফপি জানায়, বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সরকারবিরোধী নতুন কোনো বিক্ষোভ দমনে গত জানুয়ারির চেয়েও ‘আরও কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ইরানে হওয়া বিক্ষোভে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। ইরান কর্তৃপক্ষ ওই বিক্ষোভের জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছিল। কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসার এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরান আবারও ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের বিরশেবায় একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং আরও হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সফর করে দেশটির জনগণের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে গুতেরেস বলেন, ‘আমি লেবাননের জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্য বৈরুতে সফরে এসেছি। এই যুদ্ধ তারা (লেবাননের জনগণ) চায়নি। তাদের টেনে আনা হয়েছে। জাতিসংঘ ও আমি লেবানন এবং এই অঞ্চলের যে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ প্রাপ্য, সেই লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালাতে কোনো ত্রুটি রাখব না।’

২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮৭ জন নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

সৌদি আরব জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া ৫৬টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এর আগে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৩টি ড্রোন ও পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার দাবি করেছিল দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এসব ড্রোন কোথা থেকে ছোড়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা হয়নি।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি এখন যুদ্ধ পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে। তুরস্কের পরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের অনুমতি নিয়ে তুর্কি মালিকানাধীন একটি জাহাজ ওই প্রণালি পার হয়েছে। বর্তমানে আরও ১৫টি জাহাজ পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট হাবেরতুর্ক-এর তথ্য অনুযায়ী তুর্কিমন্ত্রী উরালুগ্লু বলেন, ‘সেখানে [তুর্কি মালিকানাধীন] ১৫টি জাহাজ ছিল; আমরা একটি জাহাজের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছি।’ তিনি জানান, জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে গেছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্কুল, হাসপাতালসহ বেসামরিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান।

ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি কেসি- ১৩৫ জ¦ালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় ছয় মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে এবং আরও দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে এটি শত্রুপক্ষের হামলার ফল নয়।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার দাবি, মোজতবা খামেনি সম্ভবত জীবিত আছেন, তবে তিনি গুরুতর আহত হতে পারেন। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে জানা গেছে।

ফক্স নিউজের ‘দ্য ব্রায়ান কিলমিড শো’-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি সম্ভবত (জীবিত) আছেন। আমার ধারণা, তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, তবে কোনো না কোনোভাবে সম্ভবত বেঁচে আছেন।’ গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফক্স নিউজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ মন্তব্য প্রকাশ করে।

মোজতবা খামেনি তার প্রথম বক্তব্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার অঙ্গীকার করেন। একইসঙ্গে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার আহ্বান জানান। অন্যথায় সেসব ঘাঁটিতে ইরান হামলা চালাবে বলে হুশিয়ারি দেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আকাশে একটি লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করার পর তার ধ্বংসাবশেষ শহরের একটি ভবনের সামনে পড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়।

এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিখ্যাত বুর্জ আল আরব হোটেল এলাকার দিকেও।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে রাশিয়ার তেল বিক্রির ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ২ লাখ ডলার সহায়তা ঘোষণা করেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।