ঢাকা ১০:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তাল মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমা : দুই সপ্তাহে ১৭ জাহাজে হামলা, নিহত ১

মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান জলপথগুলোতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত মাত্র দুই সপ্তাহে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং ওমান উপসাগরে অন্তত ১৭টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের সমুদ্রসীমা বিষয়ক সংস্থা ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ (UKMTO) এই উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করেছে।

UKMTO এবং ওমানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিক হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত একজন ভারতীয় নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। গত ১ মার্চ ওমান উপসাগরে ‘এমকেডি ব্যোম’ নামক একটি জাহাজে হামলার ঘটনায় এই নিহতের খবর পাওয়া যায়। একই দিনে বাহরাইন বন্দর ও হরমুজ প্রণালীতে আরও তিনটি ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়।

এরপর ৩ মার্চ ওমান উপসাগরে নোঙর করা দুটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে এবং একটি বড় মালবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ৪ মার্চ হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরে আরও তিনটি জাহাজে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিকভাবে ৬ ও ৭ মার্চ টাগ বোট এবং তেল উত্তোলনের মঞ্চেও (ড্রিলিং রিগ) ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যাতে বেশ কিছু কর্মী আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে গত ১০ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে। ‘ময়ূরী নারি’ নামক একটি কন্টেইনার জাহাজসহ মোট পাঁচটি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। ১২ মার্চ পারস্য উপসাগরে একটি কন্টেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সেটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়।

পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই স্পর্শকাতর জলপথে একের পর এক হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চরম বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি তেলের দামে। যুদ্ধকালীন ঝুঁকির কারণে এই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলোর বিমা প্রিমিয়াম (War Risk Premium) ইতিমধ্যেই বহুগুণ বেড়ে গেছে। জাহাজ মালিকরা এই বাড়তি খরচ মেটাতে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

হামলার ধরন ও ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান স্থলযুদ্ধ এখন সমুদ্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। এটি এখন একটি ‘ছায়া নৌ-যুদ্ধে’ (Shadow Naval War) রূপ নিয়েছে, যেখানে নিরপরাধ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

UKMTO-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বেসামরিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজের রুট পরিবর্তন করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয়—উভয়ই বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্যের গতিকে ধীর করে দেবে।

উত্তাল মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমা : দুই সপ্তাহে ১৭ জাহাজে হামলা, নিহত ১

আপডেট সময় : ১০:২৯:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান জলপথগুলোতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত মাত্র দুই সপ্তাহে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং ওমান উপসাগরে অন্তত ১৭টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের সমুদ্রসীমা বিষয়ক সংস্থা ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ (UKMTO) এই উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করেছে।

UKMTO এবং ওমানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিক হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত একজন ভারতীয় নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। গত ১ মার্চ ওমান উপসাগরে ‘এমকেডি ব্যোম’ নামক একটি জাহাজে হামলার ঘটনায় এই নিহতের খবর পাওয়া যায়। একই দিনে বাহরাইন বন্দর ও হরমুজ প্রণালীতে আরও তিনটি ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়।

এরপর ৩ মার্চ ওমান উপসাগরে নোঙর করা দুটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে এবং একটি বড় মালবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ৪ মার্চ হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরে আরও তিনটি জাহাজে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিকভাবে ৬ ও ৭ মার্চ টাগ বোট এবং তেল উত্তোলনের মঞ্চেও (ড্রিলিং রিগ) ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যাতে বেশ কিছু কর্মী আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে গত ১০ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে। ‘ময়ূরী নারি’ নামক একটি কন্টেইনার জাহাজসহ মোট পাঁচটি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। ১২ মার্চ পারস্য উপসাগরে একটি কন্টেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সেটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়।

পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই স্পর্শকাতর জলপথে একের পর এক হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চরম বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি তেলের দামে। যুদ্ধকালীন ঝুঁকির কারণে এই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলোর বিমা প্রিমিয়াম (War Risk Premium) ইতিমধ্যেই বহুগুণ বেড়ে গেছে। জাহাজ মালিকরা এই বাড়তি খরচ মেটাতে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

হামলার ধরন ও ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান স্থলযুদ্ধ এখন সমুদ্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। এটি এখন একটি ‘ছায়া নৌ-যুদ্ধে’ (Shadow Naval War) রূপ নিয়েছে, যেখানে নিরপরাধ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

UKMTO-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বেসামরিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজের রুট পরিবর্তন করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয়—উভয়ই বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্যের গতিকে ধীর করে দেবে।