সন্তান লালন-পালন ও একটি সুন্দর পরিবার গঠনে বাবার ভূমিকা অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন স্থানে পিতৃত্বের দায়িত্ব ও আদর্শ পিতার চারিত্রিক গুণাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নুহ (আ.), ইব্রাহিম (আ.), ইয়াকুব (আ.) ও লোকমান হাকিম (আ.)-এর মতো মহীয়সী ব্যক্তিত্বদের উদাহরণের মাধ্যমে একজন বাবার প্রকৃত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে কোরআনে।
পবিত্র কোরআনের আলোকে একজন আদর্শ পিতার ৫টি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কল্যাণ ও সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, পিতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো সততা ও সন্তানদের কল্যাণ কামনা। ইব্রাহিম (আ.) বা লোকমান (আ.)-এর মতো পিতারা ছিলেন নেককার ও আদর্শবান। অন্যদিকে আজরের মতো অসৎ পিতার উদাহরণ দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে যে, নেতিবাচক পথ পরিহার করে কল্যাণময় হওয়াই একজন পিতার প্রকৃত কাজ। সন্তানদের বিচিত্র আচরণের বিপরীতে কীভাবে ধৈর্যশীল ও সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়, তার পথ দেখিয়েছে কোরআন।
২. সন্তান লালন-পালনে সক্রিয় ভূমিকা
সন্তানের শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় একজন আদর্শ বাবা সব সময় সক্রিয় থাকেন। এটি কেবল মায়ের দায়িত্ব নয়, বরং বাবার প্রধান কাজগুলোর একটি। যেমন, নুহ (আ.) তাঁর সন্তানকে বিপথগামী থেকে বাঁচাতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন। লোকমান হাকিম তাঁর সন্তানকে হাতেকলমে নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন। ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের জন্য দোয়া করেছেন। অর্থাৎ, সন্তানের প্রয়োজনে বাবার উপস্থিতি আবশ্যক।
৩. ধৈর্য ও আত্মত্যাগ
পিতৃত্বের পথ সহজ নয়, এটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ত্যাগের। নুহ (আ.)-এর অবাধ্য সন্তানকে ফেরানোর চেষ্টা কিংবা ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র কোরবানির কঠিন পরীক্ষা—সবই ছিল ধৈর্যের চরম বহিঃপ্রকাশ। সন্তানদের সংশোধন ও সঠিক পথে রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন পিতাকে অসীম ধৈর্য ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
৪. যুক্তি ও সংলাপভিত্তিক শিক্ষা
পবিত্র কোরআন অনুযায়ী, পিতৃত্ব কোনো নিরঙ্কুশ শাসন বা ক্ষমতার নাম নয়। বরং এটি হলো সন্তানদের সাথে সংলাপ ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলা। আদর্শ পিতাগণ কখনোই সন্তানদের ওপর জোরজবরদস্তি বা শারীরিক শাস্তি চাপিয়ে দেননি। এমনকি ইব্রাহিম (আ.) তাঁর ওপর আসা ঐশী নির্দেশও পুত্রের ওপর সরাসরি চাপিয়ে না দিয়ে তাঁর মতামত জানতে চেয়েছিলেন। এটি সন্তানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে এবং পিতৃতান্ত্রিক কঠোরতা পরিহার করতে শিক্ষা দেয়।
৫. সন্তানদের ক্ষমা করার মানসিকতা
সন্তানরা ভুল করতে পারে, কিন্তু তাদের ওপর আশা না হারিয়ে ক্ষমা করার মানসিকতা থাকা একজন আদর্শ বাবার গুণ। ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্ররা তাঁর সাথে অন্যায় করা সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য ধরেছিলেন এবং তাঁদের সুপথে ফেরার অপেক্ষা করেছিলেন। যখন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছিল, তখন তিনি তাঁদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

























