ঢাকা ০৭:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি খাতে কমছে বিদেশি ঋণের চাহিদা, নেপথ্যে বিনিয়োগ স্থবিরতা

বেসরকারি খাতে কমছে বিদেশি ঋণের চাহিদা, নেপথ্যে বিনিয়োগ স্থবিরতা



ফটোকার্ড ডাউনলোড

দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ক্রমশ কমছে। দেশীয় ব্যাংকঋণের চাহিদা কমার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণেও ভাটা পড়েছে। বিনিয়োগ ও আমদানি কার্যক্রম ধীরগতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ঋণ আসার চেয়ে উদ্যোক্তারা পুরনো ঋণ পরিশোধ করছেন বেশি।

ধারাবাহিকভাবে কমছে ঋণের স্থিতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, জুন শেষে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫ কোটি ডলারে। এর আগে এপ্রিলে এই স্থিতি ছিল ১ হাজার ৩৩ কোটি ডলার। জানুয়ারিতে তা ছিল আরও বেশি, ১ হাজার ৪৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ কয়েক মাস ধরে এই ঋণ কমছেই।

এদিকে জুনে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন। বিনিয়োগে স্থবিরতা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মন্থর গতিই এর মূল কারণ।

কেন কমছে চাহিদা

সাধারণত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিটের মতো স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে থাকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং রপ্তানিতে ধীরগতির কারণে এসব ঋণের প্রয়োজনও কমেছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ডলার বাজারের অস্থিরতা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ পরিবেশে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়েও উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাই নতুন কারখানা স্থাপনে অনেকে এখনো সতর্ক।

গত কয়েক বছরের প্রবণতা

করোনা-পরবর্তী ডলার সংকটের সময় এই ঋণ দ্রুত বেড়েছিল। ২০২১ সালে তা প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ডলারে। ২০২২ সালে আরও বেড়ে হয় ১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার।

এরপর ডলার বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা বিদেশি ঋণ কমাতে শুরু করেন। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ১ হাজার ১৭৯ কোটি ডলারে এবং ২০২৪ সাল শেষে আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩ কোটি ডলারে।

মোট বিদেশি ঋণের চিত্র

চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৯ হাজার ৯১ কোটি এবং বেসরকারি খাতে ২ হাজার ২ কোটি ডলার। ডিসেম্বর শেষে এই মোট স্থিতি ছিল ১১ হাজার ৩৫ কোটি ডলার।

সুদহারে পরিবর্তন

স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের সুদহারেও সীমা টেনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মে মাসে সর্বোচ্চ সুদহার কমিয়ে এসওএফআরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ যোগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল ৪ শতাংশ পর্যন্ত।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশি ঋণের চাহিদা কমায় স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে এর নেতিবাচক দিকও আছে, কারণ এটি বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমে দুর্বলতার ইঙ্গিতও দেয়।

তাঁদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে জ্বালানি সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি জরুরি। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বিনিয়োগে গতি ফিরলে আমদানি ও শিল্প উৎপাদন বাড়বে, তখন স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের চাহিদাও আবার বাড়তে পারে।

বেসরকারি খাতে কমছে বিদেশি ঋণের চাহিদা, নেপথ্যে বিনিয়োগ স্থবিরতা

আপডেট সময় : ০৫:৩৪:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬


ফটোকার্ড ডাউনলোড

দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ক্রমশ কমছে। দেশীয় ব্যাংকঋণের চাহিদা কমার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণেও ভাটা পড়েছে। বিনিয়োগ ও আমদানি কার্যক্রম ধীরগতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ঋণ আসার চেয়ে উদ্যোক্তারা পুরনো ঋণ পরিশোধ করছেন বেশি।

ধারাবাহিকভাবে কমছে ঋণের স্থিতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, জুন শেষে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫ কোটি ডলারে। এর আগে এপ্রিলে এই স্থিতি ছিল ১ হাজার ৩৩ কোটি ডলার। জানুয়ারিতে তা ছিল আরও বেশি, ১ হাজার ৪৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ কয়েক মাস ধরে এই ঋণ কমছেই।

এদিকে জুনে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন। বিনিয়োগে স্থবিরতা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মন্থর গতিই এর মূল কারণ।

কেন কমছে চাহিদা

সাধারণত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিটের মতো স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে থাকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং রপ্তানিতে ধীরগতির কারণে এসব ঋণের প্রয়োজনও কমেছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ডলার বাজারের অস্থিরতা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ পরিবেশে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়েও উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাই নতুন কারখানা স্থাপনে অনেকে এখনো সতর্ক।

গত কয়েক বছরের প্রবণতা

করোনা-পরবর্তী ডলার সংকটের সময় এই ঋণ দ্রুত বেড়েছিল। ২০২১ সালে তা প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ডলারে। ২০২২ সালে আরও বেড়ে হয় ১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার।

এরপর ডলার বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা বিদেশি ঋণ কমাতে শুরু করেন। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ১ হাজার ১৭৯ কোটি ডলারে এবং ২০২৪ সাল শেষে আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩ কোটি ডলারে।

মোট বিদেশি ঋণের চিত্র

চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৯ হাজার ৯১ কোটি এবং বেসরকারি খাতে ২ হাজার ২ কোটি ডলার। ডিসেম্বর শেষে এই মোট স্থিতি ছিল ১১ হাজার ৩৫ কোটি ডলার।

সুদহারে পরিবর্তন

স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের সুদহারেও সীমা টেনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মে মাসে সর্বোচ্চ সুদহার কমিয়ে এসওএফআরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ যোগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল ৪ শতাংশ পর্যন্ত।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশি ঋণের চাহিদা কমায় স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে এর নেতিবাচক দিকও আছে, কারণ এটি বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমে দুর্বলতার ইঙ্গিতও দেয়।

তাঁদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে জ্বালানি সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি জরুরি। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বিনিয়োগে গতি ফিরলে আমদানি ও শিল্প উৎপাদন বাড়বে, তখন স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের চাহিদাও আবার বাড়তে পারে।