ঢাকা ০৮:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রমজান কাদিরভের উত্থান, রাজনৈতিক ভিত্তি ও লক্ষ্য কী?

রুশ প্রজাতন্ত্র চেচনিয়ার দীর্ঘমেয়াদী শাসক রমজান কাদিরভ বর্তমানে কেবল ককেশাস অঞ্চলেই নয়, বরং পুরো রুশ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক আলোচিত নাম। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বিশেষ বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করেই মূলত দাঁড়িয়ে আছে এই লৌহমানবের পুরো রাজনৈতিক কাঠামো। 

ক্রেমলিনের প্রধান শর্তই ছিল—চেচনিয়ায় কোনো বড় বিদ্রোহ বা স্বাধীনতা আন্দোলন থাকা যাবে না এবং মস্কোর প্রতি থাকতে হবে শতভাগ আনুগত্য। এর বিনিময়ে পুতিন কাদিরভকে চেচনিয়ার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে একচ্ছত্র ও স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনার অবাধ সুযোগ দিয়েছেন।

পাশাপাশি, তার ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার সুসজ্জিত ও অনুগত যোদ্ধা এবং তার বাবা আখমাদ কাদিরভের হাত ধরে তৈরি হওয়া ইসলামিক ও পারিবারিক প্রভাব কাদিরভের রাজনৈতিক ভিত্তি ও ক্ষমতার ইমারতকে শতভাগ সুরক্ষিত করেছে।

যদিও এই ক্ষমতার উত্থানের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও নাটকীয় ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তরুণ বয়সে রমজান ও তার বাবা চেচেন স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে মিলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পালটে তারা ক্রেমলিনের সঙ্গে সমঝোতা করে রাশিয়ার পক্ষে যোগ দেন।

এর ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে তার বাবা আখমাদ কাদিরভ চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন এবং রমজান হন প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে এক বোমা হামলায় বাবা আখমাদ নিহত হওয়ার পর পুতিনের বিশেষ আশীর্বাদে রমজান দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন এবং সাংবিধানিক বয়সসীমা (৩০ বছর) পূর্ণ হওয়ামাত্র ২০০৭ সালে পুতিনের মনোনয়নে আনুষ্ঠানিকভাবে চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। তখন থেকেই তিনি লৌহমানবিক কায়দায় অঞ্চলটি শাসন করে আসছেন।

এই ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং তা বজায় রাখাই কাদিরভ ও তার প্রশাসনের প্রধান উদ্দেশ্য। ২০০৭ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত রমজান চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা দায়িত্বে রয়েছেন।

পুতিনের বিশ্বস্ত ‘পদাতিক সেনা’ হিসেবে চেচনিয়ায় নিজের পরিবার ও অনুগত নিরাপত্তা চক্রের একচ্ছত্র আধিপত্য চিরস্থায়ী করার পাশাপাশি নিজের সন্তানদের ক্ষমতার উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার হয়ে বিশেষ কূটনৈতিক ও সামরিক ‘সেবা’ দিয়ে ক্রেমলিনের কাছ থেকে রাজনৈতিক অনাক্রম্যতা ও বিপুল আর্থিক সহযোগিতা আদায় করাও তার অন্যতম বড় কৌশল।

চেচনিয়ায় যেকোনো ধরনের স্বাধীন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর, ভিন্নমত বা বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা চিরতরে মুছে ফেলে একটি পুরোপুরি অনুগত সমাজব্যবস্থা বজায় রাখাই এই চেচেন শাসকের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য।

জনপ্রিয় সংবাদ

রমজান কাদিরভের উত্থান, রাজনৈতিক ভিত্তি ও লক্ষ্য কী?

আপডেট সময় : ০৫:০৮:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রুশ প্রজাতন্ত্র চেচনিয়ার দীর্ঘমেয়াদী শাসক রমজান কাদিরভ বর্তমানে কেবল ককেশাস অঞ্চলেই নয়, বরং পুরো রুশ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক আলোচিত নাম। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বিশেষ বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করেই মূলত দাঁড়িয়ে আছে এই লৌহমানবের পুরো রাজনৈতিক কাঠামো। 

ক্রেমলিনের প্রধান শর্তই ছিল—চেচনিয়ায় কোনো বড় বিদ্রোহ বা স্বাধীনতা আন্দোলন থাকা যাবে না এবং মস্কোর প্রতি থাকতে হবে শতভাগ আনুগত্য। এর বিনিময়ে পুতিন কাদিরভকে চেচনিয়ার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে একচ্ছত্র ও স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনার অবাধ সুযোগ দিয়েছেন।

পাশাপাশি, তার ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার সুসজ্জিত ও অনুগত যোদ্ধা এবং তার বাবা আখমাদ কাদিরভের হাত ধরে তৈরি হওয়া ইসলামিক ও পারিবারিক প্রভাব কাদিরভের রাজনৈতিক ভিত্তি ও ক্ষমতার ইমারতকে শতভাগ সুরক্ষিত করেছে।

যদিও এই ক্ষমতার উত্থানের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও নাটকীয় ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তরুণ বয়সে রমজান ও তার বাবা চেচেন স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে মিলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পালটে তারা ক্রেমলিনের সঙ্গে সমঝোতা করে রাশিয়ার পক্ষে যোগ দেন।

এর ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে তার বাবা আখমাদ কাদিরভ চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন এবং রমজান হন প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে এক বোমা হামলায় বাবা আখমাদ নিহত হওয়ার পর পুতিনের বিশেষ আশীর্বাদে রমজান দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন এবং সাংবিধানিক বয়সসীমা (৩০ বছর) পূর্ণ হওয়ামাত্র ২০০৭ সালে পুতিনের মনোনয়নে আনুষ্ঠানিকভাবে চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। তখন থেকেই তিনি লৌহমানবিক কায়দায় অঞ্চলটি শাসন করে আসছেন।

এই ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং তা বজায় রাখাই কাদিরভ ও তার প্রশাসনের প্রধান উদ্দেশ্য। ২০০৭ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত রমজান চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা দায়িত্বে রয়েছেন।

পুতিনের বিশ্বস্ত ‘পদাতিক সেনা’ হিসেবে চেচনিয়ায় নিজের পরিবার ও অনুগত নিরাপত্তা চক্রের একচ্ছত্র আধিপত্য চিরস্থায়ী করার পাশাপাশি নিজের সন্তানদের ক্ষমতার উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার হয়ে বিশেষ কূটনৈতিক ও সামরিক ‘সেবা’ দিয়ে ক্রেমলিনের কাছ থেকে রাজনৈতিক অনাক্রম্যতা ও বিপুল আর্থিক সহযোগিতা আদায় করাও তার অন্যতম বড় কৌশল।

চেচনিয়ায় যেকোনো ধরনের স্বাধীন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর, ভিন্নমত বা বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা চিরতরে মুছে ফেলে একটি পুরোপুরি অনুগত সমাজব্যবস্থা বজায় রাখাই এই চেচেন শাসকের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য।