ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার দেশজুড়ে পথে নামল কংগ্রেস ও বিরোধী দলের নেতা কর্মীরা। দিল্লি থেকে কলকাতা, পাটনা থেকে গুয়াহাটি, জম্মু থেকে দেরাদুন, ইম্ফল থেকে শ্রীনগর, একাধিক শহরে নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল করেন বিক্ষোভকারীরা। কোথাও পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে মিছিল আটকে দেয়, কোথাও জলকামান ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি জায়গায় বিক্ষোভকারীদের আটকও করা হয়েছে।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকা সংশোধন, নতুন ভোটারের নাম যুক্ত করা, নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাদের আপত্তির কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। তার অভিযোগ, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, ২৫ সেপ্টেম্বর রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের দফতরের সামনে বিক্ষোভ হবে।
শুক্রবার দিল্লিতে কংগ্রেস কর্মীরা নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়। পরে সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, আইসা নেত্রী নেহা বরা, অঞ্জলি ভরদ্বাজ এবং দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দিল্লিতে যুব কংগ্রেস কর্মীরা জ্ঞানেশ কুমারের ছবি দেওয়া মুখোশ পরে এবং হাতে পোস্টার নিয়ে বিক্ষোভ করেন। রাইসিনা রোড থেকে নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিলের চেষ্টা হয়। পুলিশ আগে থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে। আসামের গুয়াহাটিতেও বিক্ষোভের সময় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈকে পুলিশ আটক করে। গগৈ বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ করা উচিত এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আইনি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
পাটনায় নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল এগোলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। কংগ্রেস কর্মীরা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। কলকাতাতেও বিক্ষোভ হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের দিকে মিছিল করেন প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা কর্মীরা। তাদের হাতে ছিল জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবিতে লেখা পোস্টার। মিছিলের নেতৃত্ব দেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার।
এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কমিশনের ভিতরে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। কমিশনের সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়া হয় বলে তাদের বক্তব্য। বিজেপিও রাহুল গান্ধীর অভিযোগ খারিজ করে দাবি করেছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে। বিজেপি নেতা সুধাংশু ত্রিবেদী দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ান বলেছেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের উচিত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা। তার বক্তব্য, বিষয়টি বিরোধী দলের নেতাদের জন্য নয়, দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ফলে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এখন জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের পাশাপাশি কমিশনের ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। আগামী দিনে এই বিতর্ক আদালত ও সংসদে আরও গড়ায় কি না, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

























