বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি নোবেল পুরস্কার। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। কিন্তু কীভাবে শুরু হলো নোবেল পুরস্কার, কে এই পুরস্কার চালু করলেন এবং কী প্রক্রিয়ায় বেছে নেওয়া হয় বিজয়ীদের?
নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুইডিশ বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের নাম। ১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর প্যারিসে নিজের শেষ উইলে নোবেল তার বিপুল সম্পদের বড় অংশ পুরস্কার দেওয়ার জন্য রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার ইচ্ছা ছিল, মানবজাতির সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে- এমন কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
আলফ্রেড নোবেল ১৮৩৩ সালে স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রসায়নবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিস্ফোরক ডিনামাইট আবিষ্কার এবং ৩৫৫টি পেটেন্টের অধিকারী হিসেবে তার বিপুল সম্পদ তৈরি হয়। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতালির সানরেমোতে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তার উইল বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পাঁচ বিভাগ দিয়ে যাত্রা শুরু
নোবেলের উইল অনুযায়ী প্রথম দিকে পাঁচটি ক্ষেত্রে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়- পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, শারীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শান্তি।
তবে নোবেলের মৃত্যুর পরই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়নি। তার উইল বাস্তবায়নের জন্য নোবেল ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। অবশেষে ১৯০১ সালে প্রথমবার নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে একটি নতুন পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতির এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। এটি মূল পাঁচটি নোবেল পুরস্কারের অংশ নয়, তবে সাধারণভাবে নোবেল পুরস্কারের সঙ্গেই এটি পরিচিত।
কীভাবে মনোনয়ন হয়
নোবেল পুরস্কারের জন্য নিজের নাম নিজে প্রস্তাব করার সুযোগ নেই। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, একাডেমির সদস্য, আগের নোবেলজয়ী এবং সংসদ সদস্যসহ নির্দিষ্ট যোগ্যতার ব্যক্তিদের কাছে মনোনয়নের আমন্ত্রণ পাঠানো হয়।
মনোনয়নের শেষ সময় ৩১ জানুয়ারি। এরপর সংশ্লিষ্ট নোবেল কমিটি প্রার্থীদের নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন শুরু করে। কমিটিতে সাধারণত ৫ থেকে ১০ জন সদস্য থাকেন। তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত নেন, প্রার্থীদের কাজ পর্যালোচনা করেন এবং ধাপে ধাপে তালিকা ছোট করেন।
এই প্রক্রিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গোপনীয়তা। কোনো ব্যক্তিকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কি-না, সেই তথ্য ৫০ বছর পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় না।
শেষ সিদ্ধান্ত কারা নেন
প্রতিটি বিভাগের পুরস্কার দেওয়ার দায়িত্ব আলাদা প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও অর্থনীতির পুরস্কার নির্বাচন করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস। শারীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কার দেয় ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি। সাহিত্যের পুরস্কার নির্বাচন করে সুইডিশ একাডেমি। আর নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিজয়ী নির্বাচন করে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
মাসের পর মাস পর্যালোচনা ও আলোচনার পর অক্টোবর মাসে সংশ্লিষ্ট পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী নির্বাচন করে। এরপর অক্টোবরেই একে একে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
পুরস্কার দেওয়া হয় ১০ ডিসেম্বর
প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হয়। দিনটি আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও অর্থনীতির পুরস্কার দেওয়া হয় সুইডেনের স্টকহোমে। আর নোবেল শান্তি পুরস্কারের অনুষ্ঠান হয় নরওয়ের অসলোতে। প্রত্যেক বিজয়ী পান একটি পদক, একটি ব্যক্তিগত সনদ এবং অর্থ পুরস্কার। ২০২৬ সালে নোবেল পুরস্কারের ১২৫ বছর পূর্তি হচ্ছে। চলতি বছর প্রতিটি বিভাগে পুরস্কারের অর্থমূল্য বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা করা হয়েছে, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান।






















