ঢাকা ০১:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিব্বত নয়, পর্যটকদের নতুন পছন্দ চীনের শাংগ্রি-লা

জপমন্ত্র, লাল পোশাকের বৌদ্ধ ভিক্ষু আর বাতাসে উড়তে থাকা প্রার্থনার পতাকায় তিব্বতের আবহ অনুভব করতে চীনের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখন আর তিব্বতে যাচ্ছেন না। বরং তারা ছুটছেন পাশের ইউনান প্রদেশের জনপ্রিয় পর্যটননগরী শাংগ্রি-লায়।

সেখানে তিব্বতি সংস্কৃতির এমন এক সংস্করণ উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় উপাদান ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার প্রভাব অনেকটাই অনুপস্থিত। বরং হান-চীনা জনগোষ্ঠীর পর্যটকদের উপযোগী করে সংস্কৃতির একটি পরিমার্জিত সংস্করণ তুলে ধরা হচ্ছে।দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাংগ্রি-লার পুরনো বাজার এলাকার সরু গলিতে তিব্বতি পোশাক পরা হান-চীনা পর্যটকদের ভিড় দেখা যায়। বহু শতাব্দী পুরনো মঠ ও মন্দিরগুলোও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি তোলার আকর্ষণীয় পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পাহাড়ের চূড়ায় থাকা একটি মন্দিরে পর্যটকদের ভিড় হতো বিশাল সোনালি প্রার্থনাচক্র ঘোরাতে। প্রায় ৬৯ ফুট উঁচু এই প্রার্থনাচক্র একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছিল। কিন্তু এখন পর্যটকেরা ছুটছেন প্রায় ৩৫০ ফুট উঁচু একটি বৌদ্ধ স্তূপের কাছেও। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছর আগে এটি নির্মাণ করলেও এটিকে কার্যত ‘অ-ধর্মীয় স্থাপনা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

1

এদিকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা তিব্বতি সংস্কৃতির আকর্ষণ সম্পর্কে সচেতন। পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি চীনের হান জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তিব্বতি সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ রয়েছে। এদিকে দালাই লামা এখন নব্বইয়ের কোঠায়। অন্যদিকে বেইজিং তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দেখে। ফলে তার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের নিয়ন্ত্রণ এবং এর ভবিষ্যৎ রূপ নিয়ে প্রতিযোগিতাও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

আড়ালেই থাকছে তিব্বতি স্বাতন্ত্র্য

১৯৫৯ সালে ভারতে নির্বাসনে যাওয়ার পর থেকে দালাই লামা চীনের তিব্বতনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী তিব্বতি প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। তার অভিযোগ, এসব নীতির মাধ্যমে তিব্বতের স্বতন্ত্র পরিচয়কে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।

শাংগ্রি-লায় সেই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের একটি রূপ দেখা যায়। সেখানে তিব্বতি সংস্কৃতিকে পর্যটনপণ্য হিসেবে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সাধারণ চীনা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এবং রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।

অর্থনৈতিক কারণে এই পর্যটননির্ভর ব্যবস্থায় যুক্ত হতে অনেকটা বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় তিব্বতিরাও। কারণ পর্যটন ও মাতসুতাকে মাশরুম সংগ্রহ ছাড়া চীনের এই দুর্গম ও ঐতিহাসিকভাবে দরিদ্র অঞ্চলে আয়ের উৎস খুবই সীমিত।

2

বছরের পর বছর ধরে চীনের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে হান-প্রধান মূলধারার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করার নীতির পর অনেক জাতিগত তিব্বতি বলছেন, তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অনুভূতি দ্রুত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মঠগুলোতে তরুণ ভক্তের সংখ্যা কমছে। একই সঙ্গে অনেক তিব্বতি নিজেদের ভাষা পড়তে বা লিখতেও সমস্যায় পড়ছেন।

২০০১ সালে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শহরটির নাম পরিবর্তন করে শাংগ্রি-লা রাখার পর পর্যটনের দ্রুত বিস্তার ঘটে। এর আগে শহরটি গ্যালথাং বা চীনা ভাষায় ঝোংদিয়ান নামে পরিচিত ছিল। জেমস হিলটনের ১৯৩৩ সালের উপন্যাস ‘লস্ট হরাইজনের’ কাল্পনিক স্বর্গভূমির নাম অনুসারে নতুন নামটি রাখা হয়।

শাংগ্রি-লার শত শত পোশাক ও ছবি তোলার স্টুডিওর একটিতে কাজ করেন জাতিগত তিব্বতি মেকআপ শিল্পী চিমি লামো। পর্যটনের ঢলে বদলে যাওয়া নিজের শহর নিয়ে তিনি একই সঙ্গে আশাবাদী ও হতাশ। তার ভাষায়, ‘সবই নকল, কিন্তু আমরা কী করতে পারি?’

লামো পর্যটন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক সুফলের কথা স্বীকার করেন। তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভালো বিষয় এবং তিনি এর বিরোধিতা করেন না। তবে পর্যটনের এই বিকাশের সঙ্গে তিব্বতি সংস্কৃতির যে রূপটি সামনে আসছে, সেটি নিয়ে তার উদ্বেগ রয়েছে।

পর্যটনের চাপে বদলাচ্ছে সংস্কৃতি

পশ্চিমা পর্যটকেরা কয়েক দশক আগেই শাংগ্রি-লায় আসতে শুরু করেছিলেন। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার লকডাউনের পর চীনের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের বাইরে নতুন অভিজ্ঞতা ও অর্থপূর্ণতার সন্ধান বাড়তে থাকায় স্থানীয় পর্যটন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে দুই লাখেরও কম মানুষের এই শহরে অন্তত ৩০০টি পোশাক ও ছবি তোলার স্টুডিও রয়েছে। তবে পর্যটকদের অনেকেই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সত্যতা বা তিব্বতি সংস্কৃতির গভীরতা নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন। লামোর ভাষায়, ‘ছবিতে পোশাকটি দেখতে ভালো লাগাই তাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

3

বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা তিব্বত ১৯৫১ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত চীনের একমাত্র অঞ্চল, যেখানে বিদেশিদের ভ্রমণের জন্য অতিরিক্ত অনুমতিপত্র প্রয়োজন। এর মধ্যে দালাই লামাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সেখানে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর। শুধু তাই নয়, চীনা নাগরিকদের জন্যও তিব্বতে ভ্রমণ বেশ কঠিন।

তিব্বতের ঐতিহাসিক রাজধানী লাসায় রয়েছে বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদ। শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় অবস্থিত নগরগুলোর একটি। শাংগ্রি-লায় আসা ২২ বছর বয়সী হান চীনা তরুণী ইয়ান সিনই তিব্বতের বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদ দেখতে চান। আইনের জাতাকলে আপাতত তার কাছে শাংগ্রি-লার গ্যান্ডেন সুমৎসেলিং মঠই সেই অভিজ্ঞতার বিকল্প। শেষমেষ তিনি তিব্বতি সংস্কৃতির এই বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।

সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ

ইউনান ও ঐতিহাসিকভাবে তিব্বতি অধ্যুষিত অন্যান্য এলাকায় আটটি বিলাসবহুল বুটিক হোটেল পরিচালনা করেন দাকপা কেলদেন। ভারতে তিব্বতি নির্বাসিত পরিবারে জন্ম নেওয়া ৫৬ বছর বয়সী সাবেক এই বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতে, অর্থনৈতিকভাবে এটি ভালো। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিষয়টি নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। শাংগ্রি-লায় যে তিব্বতি সংস্কৃতি প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা মূলত ‘তিব্বতের একটি কল্পিত রূপ’।

চীনের টিকটকের স্থানীয় সংস্করণে কেলদেনের প্রায় পাঁচ লাখ অনুসারী রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি পর্যটকদের সামনে তিব্বতের সেই কৃত্রিম চিত্রের বদলে ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এর জন্য তিনি বৌদ্ধ ধর্মীয় সংগীত শেখানোর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের থাংকা (তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় চিত্রকর্ম) আঁকার প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করেন।

4

এদিকে তিব্বতি সমাজও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কমে আসছে যাযাবর জীবনধারা। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপনের প্রতি আগ্রহও কমছে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য তিব্বতিদের ‘হৃদয় ও মন’ জয় করার প্রচেষ্টার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নও যুক্ত। জাতিগত তিব্বতিদের আরও নগরকেন্দ্রিক ও ম্যান্ডারিনভাষী মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অনুভূতিও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

১৯৯৯ সালে প্রথম শাংগ্রি-লা ভ্রমণ করেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার অন চায়না ইন দ্য ওয়ার্ল্ডের পরিচালক বেন হিলম্যান। এরপর থেকেই তিনি তিব্বতি পরিচয়ের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, শাংগ্রি-লায় এমন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যা স্থানীয় কর্মকর্তারা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে চান।

হারিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি

তিব্বতি মেকআপ শিল্পী চিমি লামোর ভাষ্য, কোভিড-১৯ মহামারির আগে শাংগ্রি-লার অধিকাংশ দোকান ও রেস্তোরাঁ স্থানীয়রাই পরিচালনা করতেন। এখন বাইরের লোকজনই অন্য জায়গার আদলে তৈরি একই ধরনের পর্যটন আকর্ষণ নিয়ে আসছেন।

লামো বলেন, ‘তাদের পক্ষে আসল তিব্বতের সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার জায়গা আমরা। কিন্তু আসল জিনিসটি পাওয়া খুব কঠিন।’

পর্যটনের কারণে নিজের শহরের পরিবর্তন নিয়ে হতাশ হলেও লামো স্বীকার করেন, পরিবর্তন ঠেকানো কঠিন। তার ভাষায়, ‘আমরা স্থানীয়রাও বদলে যাচ্ছি। আমাদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।’

5

এদিকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে। এতে তিব্বতি মঠগুলোতে তরুণ ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণও কমে যাচ্ছে।

গত এক দশকের তুলনায় তরুণ তিব্বতিদের বৌদ্ধধর্ম নিয়ে পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার ওপরও কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে। জাতিগত তিব্বতিদের ভাষ্য, ‘বর্তমানে এ ধরনের সুযোগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।’

লহামো ও অন্য তিব্বতিদের পরিবারের আগের প্রজন্মে বহু মানুষ বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েছিলেন। কিন্তু নিজেদের প্রজন্মে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের ধারণা, পরবর্তী প্রজন্মেও বৌদ্ধ ভিক্ষু হওয়ার সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।

নিজে তিব্বতি ভাষা পড়তে ও লিখতে পারেন—এটিকে সৌভাগ্য মনে করেন লহামো। তবে তার মেয়েরা ম্যান্ডারিন ভাষাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং দাদির সঙ্গে তিব্বতি ভাষায় শুধু সাধারণ কিছু কথাবার্তা বলতে পারে।

লহামোর ভাষায়, পরিবারগুলো এখন আগের মতো সন্তানদের মধ্যে তিব্বতি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে পারছে না। ফলে তিব্বতি সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জ্ঞান ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। বিষয়টি দুঃখজনক হলেও তা পরিবর্তন করা কঠিন।

জনপ্রিয় সংবাদ

মেসির বিদায়ী ম্যাচে রেফারির ব্যতিক্রমী উপহার

তিব্বত নয়, পর্যটকদের নতুন পছন্দ চীনের শাংগ্রি-লা

আপডেট সময় : ১১:৩৮:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

জপমন্ত্র, লাল পোশাকের বৌদ্ধ ভিক্ষু আর বাতাসে উড়তে থাকা প্রার্থনার পতাকায় তিব্বতের আবহ অনুভব করতে চীনের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখন আর তিব্বতে যাচ্ছেন না। বরং তারা ছুটছেন পাশের ইউনান প্রদেশের জনপ্রিয় পর্যটননগরী শাংগ্রি-লায়।

সেখানে তিব্বতি সংস্কৃতির এমন এক সংস্করণ উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় উপাদান ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার প্রভাব অনেকটাই অনুপস্থিত। বরং হান-চীনা জনগোষ্ঠীর পর্যটকদের উপযোগী করে সংস্কৃতির একটি পরিমার্জিত সংস্করণ তুলে ধরা হচ্ছে।দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাংগ্রি-লার পুরনো বাজার এলাকার সরু গলিতে তিব্বতি পোশাক পরা হান-চীনা পর্যটকদের ভিড় দেখা যায়। বহু শতাব্দী পুরনো মঠ ও মন্দিরগুলোও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি তোলার আকর্ষণীয় পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পাহাড়ের চূড়ায় থাকা একটি মন্দিরে পর্যটকদের ভিড় হতো বিশাল সোনালি প্রার্থনাচক্র ঘোরাতে। প্রায় ৬৯ ফুট উঁচু এই প্রার্থনাচক্র একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছিল। কিন্তু এখন পর্যটকেরা ছুটছেন প্রায় ৩৫০ ফুট উঁচু একটি বৌদ্ধ স্তূপের কাছেও। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছর আগে এটি নির্মাণ করলেও এটিকে কার্যত ‘অ-ধর্মীয় স্থাপনা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

1

এদিকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা তিব্বতি সংস্কৃতির আকর্ষণ সম্পর্কে সচেতন। পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি চীনের হান জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তিব্বতি সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ রয়েছে। এদিকে দালাই লামা এখন নব্বইয়ের কোঠায়। অন্যদিকে বেইজিং তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দেখে। ফলে তার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের নিয়ন্ত্রণ এবং এর ভবিষ্যৎ রূপ নিয়ে প্রতিযোগিতাও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

আড়ালেই থাকছে তিব্বতি স্বাতন্ত্র্য

১৯৫৯ সালে ভারতে নির্বাসনে যাওয়ার পর থেকে দালাই লামা চীনের তিব্বতনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী তিব্বতি প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। তার অভিযোগ, এসব নীতির মাধ্যমে তিব্বতের স্বতন্ত্র পরিচয়কে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।

শাংগ্রি-লায় সেই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের একটি রূপ দেখা যায়। সেখানে তিব্বতি সংস্কৃতিকে পর্যটনপণ্য হিসেবে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সাধারণ চীনা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এবং রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।

অর্থনৈতিক কারণে এই পর্যটননির্ভর ব্যবস্থায় যুক্ত হতে অনেকটা বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় তিব্বতিরাও। কারণ পর্যটন ও মাতসুতাকে মাশরুম সংগ্রহ ছাড়া চীনের এই দুর্গম ও ঐতিহাসিকভাবে দরিদ্র অঞ্চলে আয়ের উৎস খুবই সীমিত।

2

বছরের পর বছর ধরে চীনের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে হান-প্রধান মূলধারার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করার নীতির পর অনেক জাতিগত তিব্বতি বলছেন, তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অনুভূতি দ্রুত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মঠগুলোতে তরুণ ভক্তের সংখ্যা কমছে। একই সঙ্গে অনেক তিব্বতি নিজেদের ভাষা পড়তে বা লিখতেও সমস্যায় পড়ছেন।

২০০১ সালে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শহরটির নাম পরিবর্তন করে শাংগ্রি-লা রাখার পর পর্যটনের দ্রুত বিস্তার ঘটে। এর আগে শহরটি গ্যালথাং বা চীনা ভাষায় ঝোংদিয়ান নামে পরিচিত ছিল। জেমস হিলটনের ১৯৩৩ সালের উপন্যাস ‘লস্ট হরাইজনের’ কাল্পনিক স্বর্গভূমির নাম অনুসারে নতুন নামটি রাখা হয়।

শাংগ্রি-লার শত শত পোশাক ও ছবি তোলার স্টুডিওর একটিতে কাজ করেন জাতিগত তিব্বতি মেকআপ শিল্পী চিমি লামো। পর্যটনের ঢলে বদলে যাওয়া নিজের শহর নিয়ে তিনি একই সঙ্গে আশাবাদী ও হতাশ। তার ভাষায়, ‘সবই নকল, কিন্তু আমরা কী করতে পারি?’

লামো পর্যটন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক সুফলের কথা স্বীকার করেন। তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভালো বিষয় এবং তিনি এর বিরোধিতা করেন না। তবে পর্যটনের এই বিকাশের সঙ্গে তিব্বতি সংস্কৃতির যে রূপটি সামনে আসছে, সেটি নিয়ে তার উদ্বেগ রয়েছে।

পর্যটনের চাপে বদলাচ্ছে সংস্কৃতি

পশ্চিমা পর্যটকেরা কয়েক দশক আগেই শাংগ্রি-লায় আসতে শুরু করেছিলেন। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার লকডাউনের পর চীনের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের বাইরে নতুন অভিজ্ঞতা ও অর্থপূর্ণতার সন্ধান বাড়তে থাকায় স্থানীয় পর্যটন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে দুই লাখেরও কম মানুষের এই শহরে অন্তত ৩০০টি পোশাক ও ছবি তোলার স্টুডিও রয়েছে। তবে পর্যটকদের অনেকেই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সত্যতা বা তিব্বতি সংস্কৃতির গভীরতা নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন। লামোর ভাষায়, ‘ছবিতে পোশাকটি দেখতে ভালো লাগাই তাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

3

বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা তিব্বত ১৯৫১ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত চীনের একমাত্র অঞ্চল, যেখানে বিদেশিদের ভ্রমণের জন্য অতিরিক্ত অনুমতিপত্র প্রয়োজন। এর মধ্যে দালাই লামাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সেখানে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর। শুধু তাই নয়, চীনা নাগরিকদের জন্যও তিব্বতে ভ্রমণ বেশ কঠিন।

তিব্বতের ঐতিহাসিক রাজধানী লাসায় রয়েছে বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদ। শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় অবস্থিত নগরগুলোর একটি। শাংগ্রি-লায় আসা ২২ বছর বয়সী হান চীনা তরুণী ইয়ান সিনই তিব্বতের বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদ দেখতে চান। আইনের জাতাকলে আপাতত তার কাছে শাংগ্রি-লার গ্যান্ডেন সুমৎসেলিং মঠই সেই অভিজ্ঞতার বিকল্প। শেষমেষ তিনি তিব্বতি সংস্কৃতির এই বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।

সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ

ইউনান ও ঐতিহাসিকভাবে তিব্বতি অধ্যুষিত অন্যান্য এলাকায় আটটি বিলাসবহুল বুটিক হোটেল পরিচালনা করেন দাকপা কেলদেন। ভারতে তিব্বতি নির্বাসিত পরিবারে জন্ম নেওয়া ৫৬ বছর বয়সী সাবেক এই বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতে, অর্থনৈতিকভাবে এটি ভালো। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিষয়টি নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। শাংগ্রি-লায় যে তিব্বতি সংস্কৃতি প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা মূলত ‘তিব্বতের একটি কল্পিত রূপ’।

চীনের টিকটকের স্থানীয় সংস্করণে কেলদেনের প্রায় পাঁচ লাখ অনুসারী রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি পর্যটকদের সামনে তিব্বতের সেই কৃত্রিম চিত্রের বদলে ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এর জন্য তিনি বৌদ্ধ ধর্মীয় সংগীত শেখানোর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের থাংকা (তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় চিত্রকর্ম) আঁকার প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করেন।

4

এদিকে তিব্বতি সমাজও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কমে আসছে যাযাবর জীবনধারা। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপনের প্রতি আগ্রহও কমছে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য তিব্বতিদের ‘হৃদয় ও মন’ জয় করার প্রচেষ্টার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নও যুক্ত। জাতিগত তিব্বতিদের আরও নগরকেন্দ্রিক ও ম্যান্ডারিনভাষী মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অনুভূতিও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

১৯৯৯ সালে প্রথম শাংগ্রি-লা ভ্রমণ করেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার অন চায়না ইন দ্য ওয়ার্ল্ডের পরিচালক বেন হিলম্যান। এরপর থেকেই তিনি তিব্বতি পরিচয়ের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, শাংগ্রি-লায় এমন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যা স্থানীয় কর্মকর্তারা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে চান।

হারিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি

তিব্বতি মেকআপ শিল্পী চিমি লামোর ভাষ্য, কোভিড-১৯ মহামারির আগে শাংগ্রি-লার অধিকাংশ দোকান ও রেস্তোরাঁ স্থানীয়রাই পরিচালনা করতেন। এখন বাইরের লোকজনই অন্য জায়গার আদলে তৈরি একই ধরনের পর্যটন আকর্ষণ নিয়ে আসছেন।

লামো বলেন, ‘তাদের পক্ষে আসল তিব্বতের সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার জায়গা আমরা। কিন্তু আসল জিনিসটি পাওয়া খুব কঠিন।’

পর্যটনের কারণে নিজের শহরের পরিবর্তন নিয়ে হতাশ হলেও লামো স্বীকার করেন, পরিবর্তন ঠেকানো কঠিন। তার ভাষায়, ‘আমরা স্থানীয়রাও বদলে যাচ্ছি। আমাদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।’

5

এদিকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে। এতে তিব্বতি মঠগুলোতে তরুণ ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণও কমে যাচ্ছে।

গত এক দশকের তুলনায় তরুণ তিব্বতিদের বৌদ্ধধর্ম নিয়ে পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার ওপরও কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে। জাতিগত তিব্বতিদের ভাষ্য, ‘বর্তমানে এ ধরনের সুযোগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।’

লহামো ও অন্য তিব্বতিদের পরিবারের আগের প্রজন্মে বহু মানুষ বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েছিলেন। কিন্তু নিজেদের প্রজন্মে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের ধারণা, পরবর্তী প্রজন্মেও বৌদ্ধ ভিক্ষু হওয়ার সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।

নিজে তিব্বতি ভাষা পড়তে ও লিখতে পারেন—এটিকে সৌভাগ্য মনে করেন লহামো। তবে তার মেয়েরা ম্যান্ডারিন ভাষাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং দাদির সঙ্গে তিব্বতি ভাষায় শুধু সাধারণ কিছু কথাবার্তা বলতে পারে।

লহামোর ভাষায়, পরিবারগুলো এখন আগের মতো সন্তানদের মধ্যে তিব্বতি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে পারছে না। ফলে তিব্বতি সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জ্ঞান ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। বিষয়টি দুঃখজনক হলেও তা পরিবর্তন করা কঠিন।