সরেজমিন দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়ক ঘেঁষে রয়েছে বাঁশের আড়ত। এরপর মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে ছোট একটা টিনের ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের’ অফিস। আড়তের পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল বস্তি। এ ছাড়া ১১ একর জমি ঘেঁষে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ।
সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, রাজউক জমির মালিকানা দাবি করলেও জমিটি ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ওই সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার দেখানো হয়েছে- মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসকে। সাইনবোর্ডে জমির দাগ হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯, সিটি-১৫০০৯ দেওয়া রয়েছে। যেখানে মোট জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
মেরুল বাড্ডায় ১১ একর জমি উদ্ধার ও রিট মামলা-সংক্রান্ত রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা ব্যক্ত করে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’
এদিকে রাজউকের এই জমি ঘিরে গড়ে উঠেছে আরেক ভয়াবহ চক্র। প্রায় ছয় হাজার সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এই জমির ওপরে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু হওয়া এই সমিতিতে ধাপে ধাপে ৬ হাজারের কাছাকাছি সদস্য রয়েছে।
জমির ওপরে গড়ে ওঠা এক মুদি দোকানি বলেন, জমিটি কাদের—এ আইনি অস্পষ্টতা ও জটিলতাকে পুঁজি করেই মাঠে নামে এক প্রভাবশালী চক্র। তারা ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ গঠন করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ঘোষণা দেয়, এখানে নির্মিত হবে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট। সেখানে স্বল্পমূল্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও দোকান খুলতে পারেননি সমিতির সদস্যরা। তবু টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সংঘবদ্ধচক্রটি।
২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ এক নোটিসে বলেন, মামলা খরচ ও অন্যান্য বাবদ সমিতির সদস্যদের এক হাজার টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া যেসব সদস্য মারা গেছেন এবং অন্যত্রে চলে গেছেন, তাদের সদস্যপদ ওয়ারিশদের নামে কিংবা অন্যের নামে হস্তান্তর করার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য সমিতিকে দুই হাজার টাকা করে দিতে হবে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দিয়ে সদস্যদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছ, স্থায়ী একটি দোকান পাবেন— এমন আশায় প্রায় ৬ হাজার মানুষ তাদের জমানো সঞ্চয় তুলে দেন সমিতির কাছে। রসিদের মাধ্যমে ও নানা অজুহাতে সদস্যদের কাছ থেকে দফায় দফায় তুলে নেওয়া হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
২০০৫ সালের দিকে ওই বিতর্কিত জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালায় রাজউক। এ সময় গোমর ফাঁস হয় যাবে—এমন আশঙ্কায় থমকে যায় সমিতির কার্যক্রম। সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তবে থেকে থাকেনি চতুর সমিতি চক্র। তারা নতুন করে মেরুল বাড্ডা থেকে কার্যালয় সরিয়ে নিয়ে যায় মতিঝিলে। রাজউকের আইনি জটিলতা কেটে যাবেএমন ভুয়া আশ্বাস দিয়ে রসিদের মাধ্যমে ফের চাঁদা ও কিস্তির টাকা আদায় অব্যাহত রাখে।
ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ—রাজউকের চোখের সামনে কিভাবে একটি ভুয়া সমিতি যুগের পর যুগ এভাবে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের ৩০০ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেল। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে রাজপথে বা আইনি দ্বারে কড়া নাড়ছে।
তাদের দাবি, অবিলম্বে এই ভুয়া ‘দোকানদার সমিতি’র নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় এনে কড়া শাস্তি দিতে হবে, এবং হারিয়ে যাওয়া ৩০০ কোটি টাকার হিসাব উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের উত্তরসূরিদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও।’
সমিতির আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, ‘একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এ জন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে, আমার জমানো টাকার হদিস নেই সমিতিতে।’
সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ‘১৯৮৮ সালে যাত্রা হওয়া এই সমিতিতে সদস্যরা টানা ৩০ বছর ধরে চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। গত ১০ বছর সমিতির সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।’
তিনি বলেন, ‘সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একপক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে। রাজউক বলছে—মামলা নিষ্পত্তি না হলে সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দেবে না। আমরা রাজউকের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করেছি। ২০০৫ সালে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার মামলা করা হয়েছে।’
সূত্র : কালবেলা






















