ঢাকা ০২:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামলার আগেই নীরব সৌদির সতর্কতা ব্যবস্থা, উঠছে নানা প্রশ্ন

হামলার আগেই নীরব সৌদির সতর্কতা ব্যবস্থা, উঠছে নানা প্রশ্ন

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার আগে জনসাধারণকে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। অথচ হামলার কয়েক দিন আগেই দেশটির সামরিক হামলাসংক্রান্ত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নীরব হয়ে যায়। গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরটিতে চার দফা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তবে কেন এসব হামলার আগে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে এখনও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সৌদি সরকার।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সংঘাত চললেও দেশের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। তবে ধারাবাহিক হামলার আগে সতর্কবার্তা না দেওয়ায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নাগরিক ও বিদেশি দর্শনার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চারজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, হামলার সতর্কবার্তা বন্ধ রাখার পেছনে জনজীবন স্বাভাবিক দেখানোর প্রচেষ্টা থাকতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্ত উল্টো সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌদি শিক্ষাবিদ এবং মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক সুলতান আল-আমের বলেন, সৌদি সরকার একদিকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চায়, অন্যদিকে দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাও ধরে রাখতে চায়।

এ বিষয়ে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা সিভিল ডিফেন্স এবং সরকারের গণমাধ্যম কার্যালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল রয়টার্স। তবে কোনো পক্ষই ইমেইলে পাঠানো প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়েছে। তবে এসব হামলার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নতা দেখা গেছে।

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিটি হামলার আগে নাগরিকদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। জুলাইয়ে হামলার সময়ও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান এবং জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, বাহরাইন ও কুয়েত বারবার সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সৌদি আরবও গত মে মাসে জাতীয় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করে। এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হতো। তবে হুথিদের হামলা বাড়তে থাকলেও একপর্যায়ে এ ব্যবস্থা থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

সিভিল ডিফেন্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের হামলাগুলোর আগে সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। সেটি ছিল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের জন্য।

তবে সামরিক হামলার সতর্কতা বন্ধ থাকলেও বৃষ্টি, বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়াসংক্রান্ত সতর্কবার্তা নিয়মিত প্রকাশ করে আসছিল সংস্থাটি।

এদিকে, গত মার্চে জারি করা সরকারি বিধিমালার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাগরিকদের হামলার স্থান, প্রতিরোধ করা হামলার ছবি কিংবা এ-সংক্রান্ত গুজব ও তথ্য প্রকাশ না করার নির্দেশও দেওয়া হয়। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় আবারও বিষয়টি উল্লেখ করে সিভিল ডিফেন্স।

তবে এসব বিধিনিষেধ অমান্য করার অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার আগেই একটি মিত্র পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সতর্কবার্তা বন্ধের কারণ জানতে চেয়েছিলেন।

তাদের দাবি, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বারবার সতর্কবার্তা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল। বিশেষ করে রাতে সতর্কসংকেতের শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগ করেছিলেন।

তবে এ বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনির মতে, হামলার বিষয়ে জনগণকে অবহিত রাখা এবং জনজীবনে স্বাভাবিকতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছিল রিয়াদ।

তবে তাঁর পর্যবেক্ষণ, সতর্কবার্তা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। কারণ হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়াও ঠেকাতে চায় সৌদি সরকার।

এদিকে, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ নতুন করে সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তা জারি করেছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বরের পর এটিই ছিল প্রথম সামরিক হামলাসংক্রান্ত জনসতর্কতা।

নতুন সতর্কবার্তায় রিয়াদ ও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি শহরে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়ে নাগরিকদের সতর্ক করা হয়।

তবে বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। এ বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, দেশটির বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা বেশি হওয়ায় সব জায়গায় একসঙ্গে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি বলেন, সৌদি আরবজুড়ে অসংখ্য বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র ও পাইপলাইন রয়েছে। এসব স্থাপনার প্রতিটিকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা নেই। তাঁর মতে, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত ব্যাপক।

এমন নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই সোমবার রিয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলনের আয়োজন করে সৌদি আরব। তবে কয়েকজন শীর্ষ তেল আমদানিকারক ও পেট্রোলিয়াম প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিল এনার্জি কংগ্রেসে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করেন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিদেশি অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, দেশটির নিরাপত্তার প্রতি আস্থা রেখেই অতিথিরা রিয়াদে এসেছেন। তবে সম্মেলন আয়োজনের অর্থ এই নয় যে সব ঝুঁকি কেটে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সৌদি আরব তার অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অক্টোবরের শুরু থেকে গত সোমবারের আগপর্যন্ত সৌদি কর্তৃপক্ষ সামরিক হামলার বিষয়ে কোনো জনসতর্কবার্তা না দিলেও ওই সময়ে রিয়াদে প্রায় এক ডজন হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা।

তবে সরকারি সতর্কতা ব্যবস্থা নীরব থাকলেও সৌদি আরবে অবস্থিত পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার জন্য আলাদাভাবে সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছিল।

সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তি এবং রয়টার্সের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এসব দূতাবাস থেকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সতর্কতা জারি করা হচ্ছিল।

এ পরিস্থিতিতে রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার আগে সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি দূতাবাসগুলো নিজস্ব কর্মীদের সতর্ক করলেও সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সতর্কতা ব্যবস্থা কেন নীরব ছিল, তার ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।

জনপ্রিয় সংবাদ

হামলার আগেই নীরব সৌদির সতর্কতা ব্যবস্থা, উঠছে নানা প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০১:২৭:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার আগে জনসাধারণকে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। অথচ হামলার কয়েক দিন আগেই দেশটির সামরিক হামলাসংক্রান্ত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নীরব হয়ে যায়। গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরটিতে চার দফা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তবে কেন এসব হামলার আগে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে এখনও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সৌদি সরকার।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সংঘাত চললেও দেশের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। তবে ধারাবাহিক হামলার আগে সতর্কবার্তা না দেওয়ায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নাগরিক ও বিদেশি দর্শনার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চারজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, হামলার সতর্কবার্তা বন্ধ রাখার পেছনে জনজীবন স্বাভাবিক দেখানোর প্রচেষ্টা থাকতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্ত উল্টো সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌদি শিক্ষাবিদ এবং মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক সুলতান আল-আমের বলেন, সৌদি সরকার একদিকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চায়, অন্যদিকে দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাও ধরে রাখতে চায়।

এ বিষয়ে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা সিভিল ডিফেন্স এবং সরকারের গণমাধ্যম কার্যালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল রয়টার্স। তবে কোনো পক্ষই ইমেইলে পাঠানো প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়েছে। তবে এসব হামলার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নতা দেখা গেছে।

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিটি হামলার আগে নাগরিকদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। জুলাইয়ে হামলার সময়ও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান এবং জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, বাহরাইন ও কুয়েত বারবার সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সৌদি আরবও গত মে মাসে জাতীয় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করে। এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হতো। তবে হুথিদের হামলা বাড়তে থাকলেও একপর্যায়ে এ ব্যবস্থা থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

সিভিল ডিফেন্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের হামলাগুলোর আগে সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। সেটি ছিল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের জন্য।

তবে সামরিক হামলার সতর্কতা বন্ধ থাকলেও বৃষ্টি, বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়াসংক্রান্ত সতর্কবার্তা নিয়মিত প্রকাশ করে আসছিল সংস্থাটি।

এদিকে, গত মার্চে জারি করা সরকারি বিধিমালার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাগরিকদের হামলার স্থান, প্রতিরোধ করা হামলার ছবি কিংবা এ-সংক্রান্ত গুজব ও তথ্য প্রকাশ না করার নির্দেশও দেওয়া হয়। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় আবারও বিষয়টি উল্লেখ করে সিভিল ডিফেন্স।

তবে এসব বিধিনিষেধ অমান্য করার অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার আগেই একটি মিত্র পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সতর্কবার্তা বন্ধের কারণ জানতে চেয়েছিলেন।

তাদের দাবি, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বারবার সতর্কবার্তা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল। বিশেষ করে রাতে সতর্কসংকেতের শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগ করেছিলেন।

তবে এ বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনির মতে, হামলার বিষয়ে জনগণকে অবহিত রাখা এবং জনজীবনে স্বাভাবিকতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছিল রিয়াদ।

তবে তাঁর পর্যবেক্ষণ, সতর্কবার্তা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। কারণ হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়াও ঠেকাতে চায় সৌদি সরকার।

এদিকে, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ নতুন করে সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তা জারি করেছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বরের পর এটিই ছিল প্রথম সামরিক হামলাসংক্রান্ত জনসতর্কতা।

নতুন সতর্কবার্তায় রিয়াদ ও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি শহরে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়ে নাগরিকদের সতর্ক করা হয়।

তবে বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। এ বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, দেশটির বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা বেশি হওয়ায় সব জায়গায় একসঙ্গে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি বলেন, সৌদি আরবজুড়ে অসংখ্য বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র ও পাইপলাইন রয়েছে। এসব স্থাপনার প্রতিটিকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা নেই। তাঁর মতে, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত ব্যাপক।

এমন নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই সোমবার রিয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলনের আয়োজন করে সৌদি আরব। তবে কয়েকজন শীর্ষ তেল আমদানিকারক ও পেট্রোলিয়াম প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিল এনার্জি কংগ্রেসে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করেন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিদেশি অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, দেশটির নিরাপত্তার প্রতি আস্থা রেখেই অতিথিরা রিয়াদে এসেছেন। তবে সম্মেলন আয়োজনের অর্থ এই নয় যে সব ঝুঁকি কেটে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সৌদি আরব তার অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অক্টোবরের শুরু থেকে গত সোমবারের আগপর্যন্ত সৌদি কর্তৃপক্ষ সামরিক হামলার বিষয়ে কোনো জনসতর্কবার্তা না দিলেও ওই সময়ে রিয়াদে প্রায় এক ডজন হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা।

তবে সরকারি সতর্কতা ব্যবস্থা নীরব থাকলেও সৌদি আরবে অবস্থিত পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার জন্য আলাদাভাবে সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছিল।

সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তি এবং রয়টার্সের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এসব দূতাবাস থেকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সতর্কতা জারি করা হচ্ছিল।

এ পরিস্থিতিতে রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার আগে সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি দূতাবাসগুলো নিজস্ব কর্মীদের সতর্ক করলেও সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সতর্কতা ব্যবস্থা কেন নীরব ছিল, তার ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।