একসময় স্বল্প আয়ের মানুষের আমিষের অন্যতম ভরসা ছিল পাঙাশ ও তেলাপিয়া। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেত বলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের খাবারের তালিকায় নিয়মিত জায়গা পেত মাছ দুটি। কিন্তু সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। বাজারে পাঙাশ ও তেলাপিয়ার দাম কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে নিত্যপণ্যের বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে মাছ কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকার অনুযায়ী প্রতি কেজি পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। তবে দুই থেকে তিন কেজি ওজনের বড় পাঙাশ কিনতে গুনতে হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। এর চেয়ে বড় মাছের দাম আরও বেশি। অথচ কয়েক বছর আগেও ছোট ও মাঝারি আকারের পাঙাশ পাওয়া যেত ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়।
পাঙাশের পাশাপাশি বেড়েছে তেলাপিয়ার দামও। বর্তমানে মাঝারি আকারের তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২২০ টাকায়। আর এক কেজির বেশি ওজনের বড় তেলাপিয়ার দাম উঠেছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। ২০২২ সালে প্রতি কেজি তেলাপিয়ার দাম শুরু হতো ১৪০ টাকা থেকে। সেই তুলনায় বর্তমানে মাছটির দাম প্রায় ২৫ থেকে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
দাম বাড়ার ফলে আগে যেসব পরিবার নিয়মিত পাঙাশ কিংবা তেলাপিয়া কিনত, তাদের অনেকেই এখন মাছ কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে মাঝারি আকারের তেলাপিয়ার দাম বড় পাঙাশের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সীমিত আয়ের ক্রেতাদের জন্য বিকল্প বেছে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশে মিঠাপানির মাছের মোট উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে বাণিজ্যিক খামার ও পুকুর থেকে। ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় ব্যাপকভাবে চাষ করা হয় এসব মাছ।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাণিজ্যিক পুকুরগুলোতে প্রধানত আট প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়। এগুলো হলো পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, সিলভার কার্প, মৃগেল, কমন কার্প ও কই। এর মধ্যে উৎপাদনের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে পাঙাশ ও তেলাপিয়া।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পাঙাশ উৎপাদিত হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার টন। একই সময়ে তেলাপিয়ার উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন। অর্থাৎ এক অর্থবছরেই মাছ দুটি মিলিয়ে উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। বিপুল পরিমাণ উৎপাদন সত্ত্বেও চাষ ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ ক্রেতারা কম দামে এসব মাছ কিনতে পারছেন না।
এদিকে মাছের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা ব্যবসায়ও। রাজধানীর বাড্ডা বাজারের মাছ বিক্রেতা ইসলাম জানান, বাজারে ক্রেতা এলেও আগের তুলনায় মাছ কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে মাছের দাম বেশি থাকলেও বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের লাভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
মাছের বাজারে এমন মূল্যবৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়কে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী কালাম জানান, মাছের খাবারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। তিনি জানান, আগে মাছ পরিবহনে একটি ট্রাকের ভাড়া পড়ত ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই ভাড়া ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি পরিবহনপথে লাইনম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে খামার থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই মাছের দামের সঙ্গে বাড়তি খরচ যুক্ত হচ্ছে।
এদিকে পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী মাছের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের প্রাণিজ আমিষের সহজলভ্য উৎস হিসেবে পাঙাশ ও তেলাপিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মাছ দুটির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় মাছের পরিমাণ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর।
এ পরিস্থিতিতে মাছের খাবারের দাম কমানোর পাশাপাশি স্বল্প খরচে বিকল্প খাদ্য উদ্ভাবনে গবেষণা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মাছের সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।



























