ঢাকা ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবনের প্রথম পাঁচ বছর কেন গুরুত্বপূর্ণ

জীবনের প্রথম পাঁচ বছর কেন গুরুত্বপূর্ণ

সন্তানের বয়স তিন থেকে পাঁচের মধ্যে। আপনি হয়তো তার শারীরিক গঠন যেমন খাবার, শরীরচর্চার কিংবা পড়াশোনার হাতেখড়ির দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি এড়িয়ে যাচ্ছেন যা আপনার সন্তানের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজির গবেষণায় একটি বিষয় সুপ্রতিষ্ঠিত— যেখানে বলা হচ্ছে, প্রারম্ভিক শৈশবই মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়টিতে মস্তিষ্ক এমন এক গতিতে বৃদ্ধি পায়, যা জীবনের অন্য কোনো পর্যায়ে আর ঘটে না। তিন বছর বয়সের মধ্যেই একটি শিশুর মস্তিষ্ক তার পূর্ণবয়স্ক আকারের প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছে যায়। পাঁচ বছরে তা প্রায় ৯০ শতাংশ।

জন্মের সময় শিশুর অধিকাংশ নিউরন বা স্নায়ুকোষ বিদ্যমান থাকে। এরপর যে ধীরে ধীরে এ কোষগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়, যাকে সিন্যাপস বলা হয়। সিন্যাপস চিন্তা, আবেগ, ভাষা ও আচরণকে সংগঠিত করে। মস্তিষ্ক একটি কঠোর নীতি অনুসরণ করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। যে কোষগুলো যত ব্যবহৃত হয়, তত শক্তিশালী হয়।আর যেগুলো ব্যবহার হয় না, সেগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এখানে পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। শিশুর মস্তিষ্ক একা একা বেড়ে ওঠে না,এটি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গঠিত হয়। চোখে চোখ রাখা, কথা বলা, স্নেহময় স্পর্শ এই প্রতিটি অভিজ্ঞতা স্নায়বিক সংযোগকে প্রভাবিত করে। বিজ্ঞানীরা একে ‘সার্ভ অ্যান্ড রিটার্ন’ বা পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার প্রক্রিয়া বলে থাকেন। শিশু ইঙ্গিত দিলে অভিভাবক সাড়া দেন। এই সহজ বিনিময়গুলোর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে যোগাযোগ, বিশ্বাস এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি।

এই প্রক্রিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘স্ট্রেস’ বা মানসিক চাপ। সব ধরনের চাপ ক্ষতিকর নয়। স্বল্পমেয়াদি, নিয়ন্ত্রিত চাপ কখনো কখনো বিকাশে সহায়কও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত চাপ, যাকে ‘টক্সিক স্ট্রেস’ বলা হয়, তা মস্তিষ্কের গঠনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যখন একটি শিশু দীর্ঘ সময় ধরে ভয়, অবহেলা বা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তখন তার শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা ক্রমাগত সক্রিয় থাকে। এতে উৎপন্ন হরমোনগুলো মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায় । বিশেষ করে স্মৃতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলোয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ভাষা, মনোযোগ এবং নির্বাহী কার্যকারিতার ক্ষেত্রে। পরিবেশগত বৈষম্য ধীরে ধীরে স্নায়বিক বৈষম্যে রূপ নিতে পারে।

এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়সীমা বা ‘সেনসিটিভ পিরিয়ড’। কিছু দক্ষতা শেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় সবচেয়ে উপযোগী। যেমন-ভাষা শেখা জীবনের প্রথম কয়েক বছরে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর। পরে শেখা সম্ভব হলেও, তা কঠিন হয়ে যায় এবং অনেক সময় পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছানো যায় না। একইভাবে আবেগগত বন্ধন ও সামাজিক বোঝাপড়াও এ সময়েই তৈরি হয়।

এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার মাঝেও কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শিশু বড় হলে সমস্যাগুলো নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। বাস্তবে, প্রাথমিক সমস্যাগুলো সময়ের সঙ্গে আরো জটিল হয়ে ওঠে। আবার অনেকে মনে করেন, বেশি খেলনা বা প্রযুক্তি শিশুর বিকাশে সহায়ক। কিন্তু গবেষণা বলছে মানবিক যোগাযোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকের সঙ্গে কথোপকথন, এমনকি একটি শিশুর ক্ষেত্রেও যেকোনো বস্তুগত উপকরণের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

একইভাবে, কঠোর শাসনকে অনেক সময় শক্তিশালী চরিত্র গঠনের উপায় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ভয়ভিত্তিক পরিবেশ আসলে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল করে এবং উদ্বেগ বাড়ায়। স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিকতা এবং স্নেহ এসবই সুস্থ বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

তাহলে কী প্রয়োজন একটি সুস্থ মস্তিষ্ক গঠনের জন্য? প্রয়োজন নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ, যা চাপ কমায় এবং নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। কথা বলা, গল্প শোনা, বই পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন খেলার সুযোগ। যা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং শেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এবং অবশ্যই প্রয়োজন পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা, কারণ শারীরিক সুস্থতা মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

কিছু বিষয় রয়েছে যা এ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অবহেলা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। দীর্ঘস্থায়ী ভয়, পারিবারিক অস্থিরতা বা সহিংসতা মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে আজকাল অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে, বিশেষ করে যখন তা মানবিক যোগাযোগের বিকল্প হয়ে ওঠে, ভাষা ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। শিশুকে খাওয়ানো বা নিজের ব্যস্ততার জন্য শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেয়া আপনার সন্তানের মস্তিষ্ককে ভোঁতা করে ফেলছে। তাই যতটুকু সম্ভব নিজের সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করুন। তাকে সুন্দর সুস্থ্য একটা জীবন উপহার দিন।

জীবনের প্রথম পাঁচ বছর কেন গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট সময় : ০২:২০:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

সন্তানের বয়স তিন থেকে পাঁচের মধ্যে। আপনি হয়তো তার শারীরিক গঠন যেমন খাবার, শরীরচর্চার কিংবা পড়াশোনার হাতেখড়ির দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি এড়িয়ে যাচ্ছেন যা আপনার সন্তানের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজির গবেষণায় একটি বিষয় সুপ্রতিষ্ঠিত— যেখানে বলা হচ্ছে, প্রারম্ভিক শৈশবই মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়টিতে মস্তিষ্ক এমন এক গতিতে বৃদ্ধি পায়, যা জীবনের অন্য কোনো পর্যায়ে আর ঘটে না। তিন বছর বয়সের মধ্যেই একটি শিশুর মস্তিষ্ক তার পূর্ণবয়স্ক আকারের প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছে যায়। পাঁচ বছরে তা প্রায় ৯০ শতাংশ।

জন্মের সময় শিশুর অধিকাংশ নিউরন বা স্নায়ুকোষ বিদ্যমান থাকে। এরপর যে ধীরে ধীরে এ কোষগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়, যাকে সিন্যাপস বলা হয়। সিন্যাপস চিন্তা, আবেগ, ভাষা ও আচরণকে সংগঠিত করে। মস্তিষ্ক একটি কঠোর নীতি অনুসরণ করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। যে কোষগুলো যত ব্যবহৃত হয়, তত শক্তিশালী হয়।আর যেগুলো ব্যবহার হয় না, সেগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এখানে পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। শিশুর মস্তিষ্ক একা একা বেড়ে ওঠে না,এটি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গঠিত হয়। চোখে চোখ রাখা, কথা বলা, স্নেহময় স্পর্শ এই প্রতিটি অভিজ্ঞতা স্নায়বিক সংযোগকে প্রভাবিত করে। বিজ্ঞানীরা একে ‘সার্ভ অ্যান্ড রিটার্ন’ বা পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার প্রক্রিয়া বলে থাকেন। শিশু ইঙ্গিত দিলে অভিভাবক সাড়া দেন। এই সহজ বিনিময়গুলোর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে যোগাযোগ, বিশ্বাস এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি।

এই প্রক্রিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘স্ট্রেস’ বা মানসিক চাপ। সব ধরনের চাপ ক্ষতিকর নয়। স্বল্পমেয়াদি, নিয়ন্ত্রিত চাপ কখনো কখনো বিকাশে সহায়কও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত চাপ, যাকে ‘টক্সিক স্ট্রেস’ বলা হয়, তা মস্তিষ্কের গঠনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যখন একটি শিশু দীর্ঘ সময় ধরে ভয়, অবহেলা বা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তখন তার শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা ক্রমাগত সক্রিয় থাকে। এতে উৎপন্ন হরমোনগুলো মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায় । বিশেষ করে স্মৃতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলোয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ভাষা, মনোযোগ এবং নির্বাহী কার্যকারিতার ক্ষেত্রে। পরিবেশগত বৈষম্য ধীরে ধীরে স্নায়বিক বৈষম্যে রূপ নিতে পারে।

এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়সীমা বা ‘সেনসিটিভ পিরিয়ড’। কিছু দক্ষতা শেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় সবচেয়ে উপযোগী। যেমন-ভাষা শেখা জীবনের প্রথম কয়েক বছরে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর। পরে শেখা সম্ভব হলেও, তা কঠিন হয়ে যায় এবং অনেক সময় পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছানো যায় না। একইভাবে আবেগগত বন্ধন ও সামাজিক বোঝাপড়াও এ সময়েই তৈরি হয়।

এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার মাঝেও কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শিশু বড় হলে সমস্যাগুলো নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। বাস্তবে, প্রাথমিক সমস্যাগুলো সময়ের সঙ্গে আরো জটিল হয়ে ওঠে। আবার অনেকে মনে করেন, বেশি খেলনা বা প্রযুক্তি শিশুর বিকাশে সহায়ক। কিন্তু গবেষণা বলছে মানবিক যোগাযোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকের সঙ্গে কথোপকথন, এমনকি একটি শিশুর ক্ষেত্রেও যেকোনো বস্তুগত উপকরণের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

একইভাবে, কঠোর শাসনকে অনেক সময় শক্তিশালী চরিত্র গঠনের উপায় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ভয়ভিত্তিক পরিবেশ আসলে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল করে এবং উদ্বেগ বাড়ায়। স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিকতা এবং স্নেহ এসবই সুস্থ বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

তাহলে কী প্রয়োজন একটি সুস্থ মস্তিষ্ক গঠনের জন্য? প্রয়োজন নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ, যা চাপ কমায় এবং নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। কথা বলা, গল্প শোনা, বই পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন খেলার সুযোগ। যা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং শেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এবং অবশ্যই প্রয়োজন পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা, কারণ শারীরিক সুস্থতা মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

কিছু বিষয় রয়েছে যা এ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অবহেলা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। দীর্ঘস্থায়ী ভয়, পারিবারিক অস্থিরতা বা সহিংসতা মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে আজকাল অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে, বিশেষ করে যখন তা মানবিক যোগাযোগের বিকল্প হয়ে ওঠে, ভাষা ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। শিশুকে খাওয়ানো বা নিজের ব্যস্ততার জন্য শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেয়া আপনার সন্তানের মস্তিষ্ককে ভোঁতা করে ফেলছে। তাই যতটুকু সম্ভব নিজের সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করুন। তাকে সুন্দর সুস্থ্য একটা জীবন উপহার দিন।