ঢাকা ০৪:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাল্যবিয়ের পরিধি বেড়েছে

বাল্যবিয়ের পরিধি বেড়েছে

একসময় দরিদ্র ও গ্রামীণ সমাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাল্যবিবাহ এখন শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারেও ছড়িয়ে পড়ছে। যৌন হয়রানির আশঙ্কা, সামাজিক চাপ, ‘ভালো পাত্র’ হারানোর ভয়, শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতার মতো নানা কারণে অভিভাবকরা কন্যাশিশুর বিয়েকে নিরাপত্তা ও সমাধান হিসেবে দেখছেন। ফলে বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

বর্তমানে কন্যাশিশুর নিরাপত্তার সঙ্গে বাল্যবিবাহকে এক করে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। যৌন হয়রানির আশঙ্কা থেকে মেয়েকে ‘রক্ষা’ করতে অনেক পরিবার অল্প বয়সে বিয়েকেই সহজ সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে।

২০১৩ সালে কর্নেল ল স্কুলের লিগ্যাল ইনফরমেশন ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত ‘চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ : কজ, কনসিকোয়েন্স অ্যান্ড লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, মেয়েদের যৌন হয়রানি নিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। দ্রুত বিয়ে দিলে মেয়ে নিরাপদ থাকবে—এমন ধারণা বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারে বেশি দেখা যায়। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে এই বিশ্বাস দূর করা যাচ্ছে না।

শিক্ষিত পরিবারে নতুন প্রবণতা : শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে আরেকটি প্রবণতা হলো কোনো কন্যাশিশু পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে বা আশানুরূপ ফল না করলে তাকে বিয়ে দেওয়াকে ‘সমাধান’ হিসেবে দেখা। এতে স্পষ্ট হয়, বাল্যবিবাহ শুধু অশিক্ষার ফল নয়; সচেতনতার অভাবও বড় কারণ।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল স্প্রিঙ্গার-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি অংশ মনে করে, মেয়েদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা ঝুঁকিপূর্ণ। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে মেয়েরা ‘অতিরিক্ত স্বাধীন’ হয়ে পড়ে—এমন ধারণা থেকে অনেক পরিবার স্কুলজীবনেই বিয়ে দিয়ে দেয়।

গবেষণায় শান্তা আক্তার মিম, আবু সাঈদ মো. আল মামুন, আবু সায়েম, আব্দুল ওয়াদুদ ও গোলাম হোসেন উল্লেখ করেন, অনেক পরিবার ‘ভালো পাত্র’ পাওয়ার সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় কম বয়সে বিয়ে দেওয়াকে যুক্তিযুক্ত মনে করে।

বাস্তব উদাহরণ : নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর আজাদ ইসলামের একমাত্র মেয়ে প্রমি। ১৬ বছর বয়সে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় কাতারপ্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে দেন সৌদিপ্রবাসী বাবা আজাদ ইসলাম। পরিবারের মতে, ‘ভালো পাত্র’ পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

একই গ্রামের ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র মেয়ে স্বর্ণার বেলায়ও একই ঘটনা। আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও ১৭ বছর বয়সেই তাকে প্রবাসী এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। প্রমি ও স্বর্ণার পরিবারের মতো অনেক সচ্ছল পরিবার ‘উপযুক্ত পাত্র’ হাতছাড়া না করতে কম বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।

সম্প্রতি ১৫ বছর বয়সে বিয়ের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসে মডেল সিমরিন লুবাবা। শিক্ষিত ও ধনাঢ্য পরিবারেও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি যে রয়েছে, এই ঘটনা তা নতুন করে সামনে আনে।

ইউনিসেফের ‘ফিয়ার ফর গার্লস সেফটি’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, দরিদ্র পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপ কমাতে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়। অন্যদিকে শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারেও সামাজিক মর্যাদা, সম্পর্কগত জটিলতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিশাত তাসনিম ও সবুর হোসেন তাঁদের এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, কম বয়সে যৌতুক কম লাগে—এমন ধারণা এবং ‘মেয়ের বিয়ে সম্মানের বিষয়’—এই সামাজিক বিশ্বাস গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ রোধে বড় বাধা।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতিও বাল্যবিবাহ অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া পরিবারে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ভয়, সামাজিক বদনামের আশঙ্কা এবং ‘বিয়ের বয়স হয়ে গেছে’—এমন চাপও বাল্যবিবাহের পেছনে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ সমর্থিত এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৫ সালে দেশে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৫২ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ৩৫ শতাংশে নেমে আসে। তবে ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে হার আবার বেড়ে ৫৯.২ শতাংশে দাঁড়ায় এবং বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী ২০১৮ সালে তা ছিল ৫৯ শতাংশ।

বিবিএসের ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০২৩’ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হার ছিল ৪৬.৮ শতাংশ, ২০২০ সালে ৩৪.৬ শতাংশ, ২০২১ সালে ৩৩.৮ শতাংশ, ২০২২ সালে ৪২.৯ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৪৪.৪ শতাংশ।

ডিডব্লিউয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান হারে (প্রতিবছর প্রায় ২ শতাংশ) বাল্যবিবাহ কমতে থাকলে বাংলাদেশকে বাল্যবিবাহমুক্ত হতে সময় লাগবে প্রায় ২১৫ বছর। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, কমার হার দ্বিগুণ হলেও ২০৩০ সালে বাল্যবিবাহের হার ৩০ শতাংশে থাকবে।

বাল্যবিবাহ নারীদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। জাতিসংঘের ইউএনএফপিএর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি হাজারে ৭১ জন নারী এক বা একাধিক সন্তানের মা হন। বর্তমানে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১১৫ জন।

গবেষণাগুলো বলছে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজ—উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, স্বাস্থ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক মানস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ প্রকল্পের প্রধান জ্যেষ্ঠ পরিচালক চন্দন জেড গোমেজ বলেন, ‘করোনার সময় শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধস নেমেছিল, তাতে বাল্যবিবাহ বেড়ে যায়। আইন থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, বিষয়টি সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, দেশে নারী নির্যাতন ও হেনস্তার বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের কাছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার চেয়ে নিরাপত্তা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় মাধ্যমিক স্কুল বা কলেজ দূরে হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়। ফলে তাঁরা বিয়েকেই সহজ সমাধান মনে করেন।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্য ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি কাজি ও ম্যারেজ রেজিস্ট্রারদের সচেতন করা এবং আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাল্যবিয়ের পরিধি বেড়েছে

আপডেট সময় : ১১:৪৮:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

একসময় দরিদ্র ও গ্রামীণ সমাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাল্যবিবাহ এখন শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারেও ছড়িয়ে পড়ছে। যৌন হয়রানির আশঙ্কা, সামাজিক চাপ, ‘ভালো পাত্র’ হারানোর ভয়, শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতার মতো নানা কারণে অভিভাবকরা কন্যাশিশুর বিয়েকে নিরাপত্তা ও সমাধান হিসেবে দেখছেন। ফলে বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

বর্তমানে কন্যাশিশুর নিরাপত্তার সঙ্গে বাল্যবিবাহকে এক করে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। যৌন হয়রানির আশঙ্কা থেকে মেয়েকে ‘রক্ষা’ করতে অনেক পরিবার অল্প বয়সে বিয়েকেই সহজ সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে।

২০১৩ সালে কর্নেল ল স্কুলের লিগ্যাল ইনফরমেশন ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত ‘চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ : কজ, কনসিকোয়েন্স অ্যান্ড লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, মেয়েদের যৌন হয়রানি নিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। দ্রুত বিয়ে দিলে মেয়ে নিরাপদ থাকবে—এমন ধারণা বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারে বেশি দেখা যায়। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে এই বিশ্বাস দূর করা যাচ্ছে না।

শিক্ষিত পরিবারে নতুন প্রবণতা : শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে আরেকটি প্রবণতা হলো কোনো কন্যাশিশু পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে বা আশানুরূপ ফল না করলে তাকে বিয়ে দেওয়াকে ‘সমাধান’ হিসেবে দেখা। এতে স্পষ্ট হয়, বাল্যবিবাহ শুধু অশিক্ষার ফল নয়; সচেতনতার অভাবও বড় কারণ।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল স্প্রিঙ্গার-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি অংশ মনে করে, মেয়েদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা ঝুঁকিপূর্ণ। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে মেয়েরা ‘অতিরিক্ত স্বাধীন’ হয়ে পড়ে—এমন ধারণা থেকে অনেক পরিবার স্কুলজীবনেই বিয়ে দিয়ে দেয়।

গবেষণায় শান্তা আক্তার মিম, আবু সাঈদ মো. আল মামুন, আবু সায়েম, আব্দুল ওয়াদুদ ও গোলাম হোসেন উল্লেখ করেন, অনেক পরিবার ‘ভালো পাত্র’ পাওয়ার সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় কম বয়সে বিয়ে দেওয়াকে যুক্তিযুক্ত মনে করে।

বাস্তব উদাহরণ : নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর আজাদ ইসলামের একমাত্র মেয়ে প্রমি। ১৬ বছর বয়সে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় কাতারপ্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে দেন সৌদিপ্রবাসী বাবা আজাদ ইসলাম। পরিবারের মতে, ‘ভালো পাত্র’ পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

একই গ্রামের ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র মেয়ে স্বর্ণার বেলায়ও একই ঘটনা। আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও ১৭ বছর বয়সেই তাকে প্রবাসী এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। প্রমি ও স্বর্ণার পরিবারের মতো অনেক সচ্ছল পরিবার ‘উপযুক্ত পাত্র’ হাতছাড়া না করতে কম বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।

সম্প্রতি ১৫ বছর বয়সে বিয়ের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসে মডেল সিমরিন লুবাবা। শিক্ষিত ও ধনাঢ্য পরিবারেও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি যে রয়েছে, এই ঘটনা তা নতুন করে সামনে আনে।

ইউনিসেফের ‘ফিয়ার ফর গার্লস সেফটি’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, দরিদ্র পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপ কমাতে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়। অন্যদিকে শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারেও সামাজিক মর্যাদা, সম্পর্কগত জটিলতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিশাত তাসনিম ও সবুর হোসেন তাঁদের এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, কম বয়সে যৌতুক কম লাগে—এমন ধারণা এবং ‘মেয়ের বিয়ে সম্মানের বিষয়’—এই সামাজিক বিশ্বাস গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ রোধে বড় বাধা।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতিও বাল্যবিবাহ অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া পরিবারে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ভয়, সামাজিক বদনামের আশঙ্কা এবং ‘বিয়ের বয়স হয়ে গেছে’—এমন চাপও বাল্যবিবাহের পেছনে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ সমর্থিত এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৫ সালে দেশে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৫২ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ৩৫ শতাংশে নেমে আসে। তবে ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে হার আবার বেড়ে ৫৯.২ শতাংশে দাঁড়ায় এবং বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী ২০১৮ সালে তা ছিল ৫৯ শতাংশ।

বিবিএসের ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০২৩’ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হার ছিল ৪৬.৮ শতাংশ, ২০২০ সালে ৩৪.৬ শতাংশ, ২০২১ সালে ৩৩.৮ শতাংশ, ২০২২ সালে ৪২.৯ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৪৪.৪ শতাংশ।

ডিডব্লিউয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান হারে (প্রতিবছর প্রায় ২ শতাংশ) বাল্যবিবাহ কমতে থাকলে বাংলাদেশকে বাল্যবিবাহমুক্ত হতে সময় লাগবে প্রায় ২১৫ বছর। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, কমার হার দ্বিগুণ হলেও ২০৩০ সালে বাল্যবিবাহের হার ৩০ শতাংশে থাকবে।

বাল্যবিবাহ নারীদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। জাতিসংঘের ইউএনএফপিএর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি হাজারে ৭১ জন নারী এক বা একাধিক সন্তানের মা হন। বর্তমানে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১১৫ জন।

গবেষণাগুলো বলছে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজ—উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, স্বাস্থ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক মানস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ প্রকল্পের প্রধান জ্যেষ্ঠ পরিচালক চন্দন জেড গোমেজ বলেন, ‘করোনার সময় শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধস নেমেছিল, তাতে বাল্যবিবাহ বেড়ে যায়। আইন থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, বিষয়টি সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, দেশে নারী নির্যাতন ও হেনস্তার বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের কাছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার চেয়ে নিরাপত্তা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় মাধ্যমিক স্কুল বা কলেজ দূরে হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়। ফলে তাঁরা বিয়েকেই সহজ সমাধান মনে করেন।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্য ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি কাজি ও ম্যারেজ রেজিস্ট্রারদের সচেতন করা এবং আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।