দেশে গত বছর ঈদুল আজহায় ৯১ লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়েছে বলে জানায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এর মধ্যে গরু-মহিষ কোরবানি হয়েছে ৪৭ লাখ, আর ছাগল, ভেড়া, উট ও দুম্বা কোরবানি হয়েছে ৪৪ লাখ।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের। টাকার অংকে যা ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাব ধরে)। বিশ্বজুড়ে মুসলিমপ্রধান ও উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে এমন দেশগুলোতে প্রতি বছর ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহায় বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি করা হয়। পশুপালন ও সংশ্লিষ্ট খাত দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় প্রভাব রাখে। কোরবানির পশুর সংখ্যা, বাজারমূল্য, পশুপালন ঘিরে কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবের বিচারে কোরবানিকেন্দ্রিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ।
আসন্ন কোরবানিকে সামনে রেখে দেশে বিভিন্ন বাণিজ্যিক খামার, গৃহস্থালিতে বিপুল পরিমাণ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। খামারি ও বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গরু-মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে এ বছর প্রায় সোয়া কোটির মতো পশু কোরবানি উপলক্ষে বিক্রির জন্য বাজারে উঠবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে কোরবানির পশু এবং বাজারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কোরবানি ঈদ ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এ বছরের ঈদ ঘিরে প্রাণিসম্পদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক বাজারসহ অন্য বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে। এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে সভা আছে। মিটিং শেষে সব তথ্য প্রকাশ করা হবে।’
বিশ্বজুড়ে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি করা হয়। পশু কোরবানি দেশগুলোর অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও গুরুত্ব বহন করে। আকার, বাজারমূল্য, অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবের বিচারে বাংলাদেশ এ কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির বৃহত্তম কেন্দ্র। কোরবানির পশুর বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি খামারি, গ্রামীণ ছোট উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর জন্য একটি মেগা-অর্থনৈতিক তৎপরতা হয়ে উঠেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশে ঈদুল আজহাকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সক্রিয় হয়, তা কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেনে রূপ নেয়। পশুপালন, পরিবহন, হাট ব্যবস্থাপনা, চামড়া প্রক্রিয়াকরণসহ পুরো ভ্যালু চেইনজুড়ে এ অর্থ প্রবাহিত হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ‘সার্কুলার ইকোনমি’ তৈরি হয়, যেখানে শহরের অর্থ গ্রামে পৌঁছে যায় এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোও এর সুফল পায়।
বিশ্বের অন্য মুসলিমপ্রধান দেশের কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির পরিসর বাংলাদেশের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ছোট। পাকিস্তানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০ লাখ পশু কোরবানি হয়, যেখানে গরু, ছাগল ও উটের বড় হিস্যা রয়েছে।
পাকিস্তান ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (পিটিএ) বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জিএনএন জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে ঈদুল আজহায় পাকিস্তানে মোট ৭৪ লাখ ১৮ হাজার পশু কোরবানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ গরু, ছাগল ৩৫ লাখ, ভেড়া চার লাখ, মহিষ দুই লাখ এবং উট ৬৭ হাজারের মতো। পিটিএ ২০২৪ সালের পশু কোরবানির হিসাবে বলছে, ওই বছরে সংখ্যাটা ছিল ৬৮ লাখ ৮ হাজার ৭০০টি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ মুসলিমপ্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ কোটি, যার মধ্যে ৮৬ শতাংশ নাগরিক মুসলিম। দেশটিতে ২০২৫ সালে ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি হয়েছে ১৮ লাখ ৫৬ হাজার, যার মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৬ লাখ ২৭ হাজার এবং ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ১২ লাখ ২৯ হাজার। দেশটির ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইন্দোনেশিয়া নিউজ এজেন্সি আঙ্কারা এসব তথ্য জানিয়েছে।
সৌদি আরবে প্রতি বছর হজের সময় কোরবানি হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ পশু। তবে দেশটির এ পশুর সরবরাহ মূলত আমদানিনির্ভর। কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে সুদান, সোমালিয়া ও ব্রাজিল থেকে পশু আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ব্রাজিল থেকে সৌদি তার চাহিদার ২০ শতাংশ পশু আমদানি করে থাকে।
মুসলিমপ্রধান বড় অর্থনীতির দেশ তুরস্কে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পশু কোরবানি হয়। তবে এ সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। দেশটির কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, গত বছরের ঈদুল আজহায় তুরস্কে মোট ৩৮ লাখ পশু কোরবানি করা হয়। আর মিসরে ২০২৫ সালে কোরবানির পশুর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ। এর মধ্যে পাঁচ লাখ গরু এবং সাত লাখ ছাগল ও অন্যান্য পশু কোরবানি করা হয় বলে জানিয়েছে মিসরের স্থানীয় গণমাধ্যম আল আহরাম ও মিসর টুডে।
বিশ্বের মুসলিমপ্রধান অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কোরবানির পশুর বাজার বড় হওয়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশ শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং একটি নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। পশুপালন, কর্মসংস্থান এবং বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম—সবকিছু মিলিয়ে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে মৌসুমি হলেও শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছে। নীতিসহায়তা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য দরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত দেশের জন্য ভবিষ্যতে আরো বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বেঙ্গল মিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এএফএম আসিফ বলেন, ‘আমাদের যে পপুলেশন ডেনসিটি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি, তাতে সামনে কোরবানির বাজার আরো বড় হবে। এখনো দেশের অনেক মানুষ কোরবানি করার সামর্থ্য অর্জন করেননি—যখনই তারা অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হবেন, তারা এ ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করবেন। মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোরবানির পশুর বাজার আরো সম্প্রসারিত হবে।’
এ বছরের কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জেলায় পশু প্রস্তুত করা হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় কোরবানির ১ লাখ ২০ হাজার পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলায় ১৩ হাজার খামারে দেশীয় পদ্ধতিতে এসব পশু পালন করা হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপপরিচালক ডাক্তার এফএম মান্নান কবির বলেন, ‘আসন্ন কোরবানি ঈদের চাহিদা মিটিয়েও অন্তত ১৮ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। জেলার সাতটি উপজেলায় কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ২২টি।’
বগুড়ায় কোরবানির জন্য ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহায় বগুড়া জেলার ১২ উপজেলায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭টি বিভিন্ন ধরনের পশু প্রস্তুত রয়েছে।
খুলনা বিভাগে এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা গত বছরের তুলনায় দুই লাখ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম হায়দার জানিয়েছেন, এ বছর খুলনা বিভাগে কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার। আর পশু প্রস্তুত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ। (সূত্র: বাসস)
ময়মনসিংহ জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ১ লাখ ৮০ হাজার। জেলায় এ বছর প্রস্তুত হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার পশু। চাহিদার চেয়ে ৪৪ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তরের জেলা রংপুরেও বিপুলসংখ্যক পশু প্রস্তুত করেছেন খামারিরা। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯১টি।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে কোরবানির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। শুধু কোরবানির জন্য নয়, দেশের মোট পশুর চাহিদা পূরণে এরই মধ্যে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এতে পশু আমদানির প্রয়োজন পড়ছে না। এ খাতে বহু উদ্যোক্তা যেমন তৈরি হয়েছেন, তেমনি তরুণ-যুবক ও নারীদের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে কোরবানির বড় অবদান রয়েছে। ঈদকে টার্গেট করে অনেক কৃষক ও খামারি গরু-ছাগল পালন করে থাকেন। আমরা পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। কোরবানির জন্য এখন আর পশু আমদানি করতে হয় না। এটি অর্থনীতির জন্য ভালো দিক। তবে বিগত কয়েক বছর কোরবানির পশু পালনের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তারা অনেকে লোকসান গুনেছেন। এর কারণ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় মাংস ও পশুর দাম বাড়ছে। এতে উৎপাদিত গরু-ছাগলের একটা অংশ ঈদে অবিক্রীত থাকছে। এজন্য তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ জায়গায় সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পশুখাদ্য ও পশুর ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।’
প্রাণিসম্পদ খাতকে কর্মসংস্থানের বড় উৎস হিসেবে কাজে লাগাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। জাতীয় সংসদে ১৬ এপ্রিল এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বেকারত্ব হ্রাসে তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরো বলেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বনির্ভর জনগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, সরকার যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সিলেট অঞ্চলে দেশীয় দুগ্ধ গাভীর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, উত্তর-মধ্যাঞ্চলের চর ও নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল মুরগির জাত সম্প্রসারণে কেন্দ্রীয় পোলট্রি খামারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ সেবা উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন সেবা আধুনিকায়ন এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ভেটেরিনারি সেবা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, পোলট্রি ও হাঁস খামার সেবা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র জাবরকাটা প্রাণী খামারের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে।























