ঢাকা ০২:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ভদ্র’ থাকতে চান না ট্রাম্প, ইরানেরও লক্ষ্য স্থির

‘ভদ্র’ থাকতে চান না ট্রাম্প, ইরানেরও লক্ষ্য স্থির

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি এবং ইরানের অনড় অবস্থানের কারণে এই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের প্রতি নরম মনোভাব দেখানোর সময় শেষ। এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে, যেখানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরানকে উদ্দেশ্য করে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। ট্রাম্পের অভিযোগ, তেহরান পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির পথে হাঁটছে না। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের কঠিন পরিণতির শিকার হতে হবে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির বিপরীতে ইরানও তাদের সামরিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। দেশটির সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান, তারা তাদের লক্ষ্যবস্তুর তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ করেছে এবং যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ইরানের জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে ফার্স নিউজ এজেন্সি। তাদের তথ্যমতে, গত ৭২ ঘণ্টায় ৩১টি তেলবাহী ট্যাঙ্কারসহ মোট ৫২টি ইরানি জাহাজ মার্কিন নৌ-অবরোধ ভেঙে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছেছে।

দীর্ঘ ৫৭ দিন বন্ধ থাকার পর তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুনরায় চালু হয়েছে। তবে যুদ্ধের প্রভাবে কার্যক্রম এখনো অত্যন্ত সীমিত। স্বাভাবিক সময়ে দিনে ১০০ থেকে ১৫০টি ফ্লাইট চললেও বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া মেহরাবাদসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলো হামলার শিকার হওয়ায় ইরানের বিমান খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ দীর্ঘায়িত করার ট্রাম্পের নির্দেশের খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১.৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১০০.৫০ ডলারে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি আংশিক অবরুদ্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে পানামা খাল ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইরানের ‘ছায়া ব্যাংকিং’ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানতে ৩৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন করত।

এই পরিস্থিতির মধ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের অধিকার তেহরানের আছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী ১ মে থেকে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ‘ওপেক প্লাস’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

সংকট সমাধানে পাকিস্তান মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দাবি, তাদের প্রচেষ্টাতেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। এদিকে জার্মানি এই সমস্যা নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের পাল্টা প্রতিরোধের হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বড় অনিশ্চয়তার মেঘ তৈরি করেছে।

হত্যার শিকার লিমনের মরদেহ দেশে আসবে ৪ মে

‘ভদ্র’ থাকতে চান না ট্রাম্প, ইরানেরও লক্ষ্য স্থির

আপডেট সময় : ১০:৩৪:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি এবং ইরানের অনড় অবস্থানের কারণে এই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের প্রতি নরম মনোভাব দেখানোর সময় শেষ। এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে, যেখানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরানকে উদ্দেশ্য করে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। ট্রাম্পের অভিযোগ, তেহরান পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির পথে হাঁটছে না। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের কঠিন পরিণতির শিকার হতে হবে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির বিপরীতে ইরানও তাদের সামরিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। দেশটির সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান, তারা তাদের লক্ষ্যবস্তুর তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ করেছে এবং যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ইরানের জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে ফার্স নিউজ এজেন্সি। তাদের তথ্যমতে, গত ৭২ ঘণ্টায় ৩১টি তেলবাহী ট্যাঙ্কারসহ মোট ৫২টি ইরানি জাহাজ মার্কিন নৌ-অবরোধ ভেঙে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছেছে।

দীর্ঘ ৫৭ দিন বন্ধ থাকার পর তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুনরায় চালু হয়েছে। তবে যুদ্ধের প্রভাবে কার্যক্রম এখনো অত্যন্ত সীমিত। স্বাভাবিক সময়ে দিনে ১০০ থেকে ১৫০টি ফ্লাইট চললেও বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া মেহরাবাদসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলো হামলার শিকার হওয়ায় ইরানের বিমান খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ দীর্ঘায়িত করার ট্রাম্পের নির্দেশের খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১.৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১০০.৫০ ডলারে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি আংশিক অবরুদ্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে পানামা খাল ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইরানের ‘ছায়া ব্যাংকিং’ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানতে ৩৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন করত।

এই পরিস্থিতির মধ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের অধিকার তেহরানের আছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী ১ মে থেকে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ‘ওপেক প্লাস’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

সংকট সমাধানে পাকিস্তান মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দাবি, তাদের প্রচেষ্টাতেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। এদিকে জার্মানি এই সমস্যা নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের পাল্টা প্রতিরোধের হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বড় অনিশ্চয়তার মেঘ তৈরি করেছে।