বিশ্ববাণিজ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘শুল্ক যুদ্ধ’ বড় ধরনের আইনি ধাক্কার মুখে পড়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’-কে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করায় নতুন মোড় নিয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি। এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং তৈরি পোশাক খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল। বিশেষ করে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (IEEPA) ব্যবহার করে বসানো এই শুল্ককে ‘অর্থনৈতিক জবরদস্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। আদালতের এই রায়ের ফলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপিয়ে দেওয়া আগের শুল্ক হার ও চুক্তিগুলো আইনি ভিত্তি হারিয়েছে।
আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প পিছু না হটে বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন। রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ১২২ ধারা ব্যবহার করে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ১৯ শতাংশ শুল্ক আপাতত কমে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুল্কের হার পরিবর্তন হলেও আগের চুক্তির অন্যান্য শর্তগুলো বহাল থাকবে বলে তারা আশা করছে।
নতুন এই ১০ শতাংশ শুল্ক আপাতত ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ, শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, মজুরি কাঠামো এবং পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিবিড়ভাবে তদন্ত করবে। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তবে শুল্কের হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আর যদি পরিস্থিতি সন্তোষজনক হয়, তবে শুল্ক শূন্যের কোঠায় নেমে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা ট্রাম্পের এই নীতিকে শুরু থেকেই ‘অনিশ্চিত’ ও ‘অসম’ বলে বর্ণনা করে আসছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন এবং চারটি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়েছিল, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘জবরদস্তিমূলক’ মনে করেন।
বিকেএমইএ-র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “এই চুক্তিটি ছিল অসম, যেখানে আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে শর্তই ছিল বেশি। ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি এতটাই অনিশ্চিত যে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা বলা কঠিন।”
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই মুহূর্তে তড়িঘড়ি না করে বাংলাদেশের উচিত ধৈর্য ধরা। তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায় আমাদের জন্য সুখবর হলেও এখনই পুরোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় আসেনি। বরং পরবর্তী ১৫০ দিনের জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ ঘাটতিগুলো পূরণ করে প্রস্তুত থাকতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি বিশাল রপ্তানি বাজার। ৮০০ কোটি ডলারের এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের পাল্লা ভারী থাকলেও মার্কিন প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নতুন নতুন শর্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য আগামী দিনগুলোতে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
























