দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের বিনিয়োগ খাতে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে যাচ্ছে সরকার। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিশেষ নজর দিয়ে সামগ্রিক বিনিয়োগকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৪.৫ শতাংশে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যেখানে বেসরকারি খাতের অবদান ২১.৪ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ১৩.১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং বেকারত্ব দূরীকরণে এই বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছে সরকার। খবর সূত্রের।
অর্থ বিভাগের মতে, এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে দ্রুত গতি ফিরবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি খাত নতুন করে উজ্জীবিত হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এবং ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি অনিশ্চয়তা এ লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশে চলমান গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি দাম, অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের চাপের মধ্যে এ বিপুল পরিমাণ নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সূত্র জানিয়েছে, সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে চায় সরকার। গত কয়েকটি অর্থবছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট এবং তীব্র জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির প্রায় ৩০.২ শতাংশ এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩০.৮ থেকে ৩১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ বিগত বছরগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল। তবে নতুন সরকার আশা করছে, বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে উদ্যোক্তারা এখন নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, আগামী বাজেটে বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কয়েকটি বিশেষ পদক্ষেপের কথা ভাবছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ, দেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ প্রণোদনা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) জোরদার করা এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিসের আওতা বাড়িয়ে ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধি। এ ছাড়া নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে স্টার্টআপ সহায়তা ও বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর কাঠামো সহজ ও স্থিতিশীল করা এবং প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এ বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ ও জ্বালানি-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে কেউ বড় বিনিয়োগে যাবে না। এ ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিসকে কার্যকর করতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানি খাত এখন গ্যাস সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাসের কারণে বহুমুখী চাপে আছে। এ পরিস্থিতিতে সহজ শর্তে ঋণ, ব্যাংক সুদহার কমানো এবং রপ্তানিতে নগদ সহায়তা বৃদ্ধি না করলে নতুন বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
জানা গেছে, গত কয়েকটি অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। বিশেষ করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে যেতে অনীহা দেখিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার আশা করছে, রাজনৈতিক সংকট না থাকায় এখন উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে বাজেটের আকার বৃদ্ধি অপরিহার্য। ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া এবং অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর নীতি সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে ‘ক্রাউড আউট’ করে দেয় বলেও জানান তিনি। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। বেসরকারি খাত বড় হতে পারছে না, কারণ সরকারই অধিকাংশ অর্থ নিয়ে নিচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যা বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি রেস্তোরাঁর লাইসেন্স পেতে প্রায় ৩৯টি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করে। এভাবে চলতে পারে না। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসা সহজ করতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

























