দেশের শিক্ষা প্রশাসনে দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে এক যুগান্তকারী সমন্বয় সাধন করেছে বর্তমান সরকার। প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যে বিদ্যমান নীতিনির্ধারণী দূরত্ব ঘোচাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একই নেতৃত্বের অধীনে আনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছে একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর হাতে। ফলে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো থাকলেও এখন থেকে শিক্ষার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে একই টেবিলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এর আগে দুই মন্ত্রণালয় পৃথক নেতৃত্বে থাকায় কারিকুলাম, পাঠদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চরম অসামঞ্জস্য দেখা দিত। বিশেষ করে প্রাথমিক শেষ করে মাধ্যমিকে পদার্পণের সময় শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সমন্বয়হীনতার শিকার হতো। এখন ‘এক কমান্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে একই নেতৃত্ব দুই দপ্তরের চাবিকাঠি পাওয়ায় এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে আলাদাভাবে প্রকল্প গ্রহণের ফলে লার্নিং আউটকাম বা শেখার লক্ষ্যমাত্রায় ধারাবাহিকতা থাকত না। এমনকি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দুই মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনায় কারিকুলাম চূড়ান্ত করতে হিমশিম খেত। বর্তমান কাঠামোয় সমন্বিত সিদ্ধান্ত আসা সহজ হবে।
শিক্ষাখাতের স্থবিরতা কাটাতে প্রশাসনিক গতিশীলতায় ‘৭২ ঘণ্টার নিয়ম’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব নিয়েই স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ফাইল দপ্তরে তিন দিনের বেশি আটকে রাখা যাবে না। ফাইল জট ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কমাতে তিনি কঠোর অবস্থানে থাকবেন।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা— উভয় মন্ত্রণালয়ের কোনো ফাইলই প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের ‘স্ক্রিনিং’ বা পর্যবেক্ষণ ছাড়া সরাসরি মন্ত্রীর টেবিলে যাবে না। এই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সমন্বিত যাত্রার ফলে কারিকুলাম উন্নয়ন ও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় সুফল আসবে। আগে দুই সচিবালয়ের ফাইল চালাচালিতে যে সময়ক্ষেপণ হতো, তা এখন দ্রুত সমাধান হবে। এছাড়া বাজেট বরাদ্দ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একই কাজের পুনরাবৃত্তি বা ‘ওভারল্যাপিং’ হওয়ার সুযোগ থাকবে না। এর ফলে গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত বৈষম্য দূর করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কারিকুলাম বাস্তবায়ন সহজতর হবে।
এই বিশাল উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নকে ‘মিলন-ববি’ জুটির জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, “প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা একই কাঠামোর অধীনে আনার উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; প্রশাসনিক কাঠামো, পরিকল্পনা এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রকৃত সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এগোলে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “অতীতে আলাদা নীতিমালার কারণে যে জটিলতা ছিল, এখন একই ছাতার নিচে কাজ করায় তা দূর হবে। সব সিদ্ধান্ত হবে সমন্বিত আলোচনার ভিত্তিতে। প্রশাসনিক গতি বাড়াতে এবং সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নে আমরা বিন্দুমাত্র দেরি করব না।”























