ঢাকা ১১:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংকটে ২০ ব্যাংক: ঘাটতির পরিমাণ পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা

সংকটে ২০ ব্যাংক: ঘাটতির পরিমাণ পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা

অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি আর ক্রমাগত লুণ্ঠনের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তহবিল সংরক্ষণে একের পর এক ব্যাংক ব্যর্থ হওয়ায় পুরো খাত গভীর ঝুঁকিতে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিশেষায়িত মিলিয়ে দেশের ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে; যার সম্মিলিত পরিমাণ ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।

এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় বছরের শেষ প্রান্তিকে ঘাটতি কিছুটা কমলেও অর্থনীতিবিদরা একে প্রকৃত উন্নতি মানতে নারাজ। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত বিশেষ ছাড়ের কারণেই কাগজে-কলমে এই ঘাটতি কিছুটা কম দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি অংশকে নিয়মিত দেখানো হয়েছে। এতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা কমেছে। যেহেতু মূলধন থেকেই প্রভিশন রাখতে হয়, তাই প্রভিশনের চাপ কমায় মূলধন ঘাটতিও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

একটি ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়, তখন তাকে মূলধন ঘাটতি বলা হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন রাখা আইনি বাধ্যবাধকতা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার প্রধান সূচক ‘ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও’ (সিআরএআর) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের রেকর্ড ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, আগ্রাসী ব্যাংকিং ও খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।

সংকটগ্রস্ত ২০টি ব্যাংকের খাতভিত্তিক ঘাটতির বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. ইসলামী ধারার ব্যাংক (৭টি)

সবচেয়ে বেশি মূলধন সংকটে রয়েছে ইসলামী ধারার সাতটি ব্যাংক। এদের সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।

  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক: ৬৪,১৬২ কোটি টাকা (সবচেয়ে উদ্বেগজনক)

  • সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক: ৩০,০৫৩ কোটি টাকা

  • ইউনিয়ন ব্যাংক: ২৯,৬৫৩ কোটি টাকা

  • এক্সিম ব্যাংক: ২৫,৯১৪ কোটি টাকা

  • গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক: ১৫,৬৯৩ কোটি টাকা

  • ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ: ৬,৫৯৭ কোটি টাকা

  • আইসিবি ইসলামী ব্যাংক: ২,০১২ কোটি টাকা

২. রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক (৪টি)

চারটি সরকারি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

  • জনতা ব্যাংক: ২২,৪৮২ কোটি টাকা

  • অগ্রণী ব্যাংক: ৬,৫৩৪ কোটি টাকা

  • রূপালী ব্যাংক: ৪,১৮৯ কোটি টাকা

  • বেসিক ব্যাংক: ৪,১৫৮ কোটি টাকা

৩. বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক (৭টি)

বেসরকারি খাতের সাতটি ব্যাংকে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩,১৩৮ কোটি টাকা।

  • ন্যাশনাল ব্যাংক: ৯,০৩২ কোটি টাকা

  • এবি ব্যাংক: ৬,৫৫১ কোটি টাকা

  • পদ্মা ব্যাংক: ৫,৮৩৭ কোটি টাকা

  • প্রিমিয়ার ব্যাংক: ৪,৮৬৬ কোটি টাকা

  • আইএফআইসি ব্যাংক: ৪,৭০৪ কোটি টাকা

  • বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক: ২,০৬৫ কোটি টাকা

  • সিটিজেনস ব্যাংক: ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা

৪. বিশেষায়িত ব্যাংক (২টি)

বিশেষায়িত খাতের দুটি সরকারি ব্যাংকেও বড় অঙ্কের ঘাটতি রয়েছে।

  • বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক: ৩০,৭৫১ কোটি টাকা

  • রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক: ২,৭০৪ কোটি টাকা

ব্যাংকাররা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ক্রমাগত মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা ডেকে আনবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি দেখানো গেলেও খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

সংকটে ২০ ব্যাংক: ঘাটতির পরিমাণ পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা

সংকটে ২০ ব্যাংক: ঘাটতির পরিমাণ পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা

আপডেট সময় : ১০:২৩:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি আর ক্রমাগত লুণ্ঠনের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তহবিল সংরক্ষণে একের পর এক ব্যাংক ব্যর্থ হওয়ায় পুরো খাত গভীর ঝুঁকিতে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিশেষায়িত মিলিয়ে দেশের ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে; যার সম্মিলিত পরিমাণ ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।

এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় বছরের শেষ প্রান্তিকে ঘাটতি কিছুটা কমলেও অর্থনীতিবিদরা একে প্রকৃত উন্নতি মানতে নারাজ। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত বিশেষ ছাড়ের কারণেই কাগজে-কলমে এই ঘাটতি কিছুটা কম দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি অংশকে নিয়মিত দেখানো হয়েছে। এতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা কমেছে। যেহেতু মূলধন থেকেই প্রভিশন রাখতে হয়, তাই প্রভিশনের চাপ কমায় মূলধন ঘাটতিও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

একটি ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়, তখন তাকে মূলধন ঘাটতি বলা হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন রাখা আইনি বাধ্যবাধকতা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার প্রধান সূচক ‘ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও’ (সিআরএআর) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের রেকর্ড ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, আগ্রাসী ব্যাংকিং ও খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।

সংকটগ্রস্ত ২০টি ব্যাংকের খাতভিত্তিক ঘাটতির বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. ইসলামী ধারার ব্যাংক (৭টি)

সবচেয়ে বেশি মূলধন সংকটে রয়েছে ইসলামী ধারার সাতটি ব্যাংক। এদের সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।

  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক: ৬৪,১৬২ কোটি টাকা (সবচেয়ে উদ্বেগজনক)

  • সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক: ৩০,০৫৩ কোটি টাকা

  • ইউনিয়ন ব্যাংক: ২৯,৬৫৩ কোটি টাকা

  • এক্সিম ব্যাংক: ২৫,৯১৪ কোটি টাকা

  • গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক: ১৫,৬৯৩ কোটি টাকা

  • ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ: ৬,৫৯৭ কোটি টাকা

  • আইসিবি ইসলামী ব্যাংক: ২,০১২ কোটি টাকা

২. রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক (৪টি)

চারটি সরকারি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

  • জনতা ব্যাংক: ২২,৪৮২ কোটি টাকা

  • অগ্রণী ব্যাংক: ৬,৫৩৪ কোটি টাকা

  • রূপালী ব্যাংক: ৪,১৮৯ কোটি টাকা

  • বেসিক ব্যাংক: ৪,১৫৮ কোটি টাকা

৩. বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক (৭টি)

বেসরকারি খাতের সাতটি ব্যাংকে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩,১৩৮ কোটি টাকা।

  • ন্যাশনাল ব্যাংক: ৯,০৩২ কোটি টাকা

  • এবি ব্যাংক: ৬,৫৫১ কোটি টাকা

  • পদ্মা ব্যাংক: ৫,৮৩৭ কোটি টাকা

  • প্রিমিয়ার ব্যাংক: ৪,৮৬৬ কোটি টাকা

  • আইএফআইসি ব্যাংক: ৪,৭০৪ কোটি টাকা

  • বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক: ২,০৬৫ কোটি টাকা

  • সিটিজেনস ব্যাংক: ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা

৪. বিশেষায়িত ব্যাংক (২টি)

বিশেষায়িত খাতের দুটি সরকারি ব্যাংকেও বড় অঙ্কের ঘাটতি রয়েছে।

  • বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক: ৩০,৭৫১ কোটি টাকা

  • রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক: ২,৭০৪ কোটি টাকা

ব্যাংকাররা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ক্রমাগত মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা ডেকে আনবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি দেখানো গেলেও খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।