ঢাকা ০৪:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল বাচ্চাগুলো!

যমজ সন্তান হারানো মা নাজমা বেগম

রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সম্প্রতি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। সেই ভয়াল রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে মুখ খুলেছেন যমজ সন্তান হারানো এক হতভাগ্য মা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং কর্তব্যরতদের অনুপস্থিতির এক লোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন তিনি। এদিকে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ার কথা রয়েছে।

ভুক্তভোগী মা নাজমা বেগম জানান, গত শনিবার বিকেলে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরদিন রোববার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যমজ পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের পর শিশুরা সম্পূর্ণ সুস্থ থাকায় পরিবারজুড়ে ছিল ঈদের আনন্দ। এমনকি বাড়ি ফিরে আকিকার দাওয়াতের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই সব আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়।

নাজমা বেগমের মারা যাওয়া যমজ সন্তান
নাজমা বেগমের মারা যাওয়া যমজ সন্তান

নাজমা বেগমের ভাষ্যমতে, বুধবার রাত ২টার দিকে একটি শিশু হঠাৎ বমি করে চিৎকার শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরেই অপর শিশুটিও অসুস্থ হয়ে পড়ে। একই সময়ে ওয়ার্ডের অন্য শিশুরাও একে একে গুরুতর অসুস্থ হতে থাকে। অভিযোগ উঠেছে, সেই সংকটময় মুহূর্তে ওয়ার্ডে কোনো ডিউটি নার্স বা ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন না। একজন আয়া দায়সারাভাবে ‘কিছু হয়নি’ বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও, কিছুক্ষণ পরই সেখানে প্রথম শিশুটি মারা যায়।

ভুক্তভোগী পরিবারটি জানায়, নবজাতকদের ওয়ার্ডের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। পুরো ওয়ার্ডে তীব্র ভ্যাপসা গরম, দুর্গন্ধ এবং ছারপোকা ও তেলাপোকার উপদ্রব ছিল আশঙ্কাজনক। এমনকি খাবারের ওপর তেলাপোকা ঝাঁক বেঁধে থাকত। বয়স্ক অভিভাবকদের কেউ কেউ ঠান্ডার ভয়ে ফ্যান বা এসি বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও দমবন্ধ হয়ে ওঠে। রাত ২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এই বৈরী পরিবেশে থেকে শিশুরা মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ে।

সকালে শিশুদের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে স্বজনরা তাদের এনআইসিইউর (NICU) সামনে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও দায়িত্বরত নার্সরা অন্য শিশুদের চিকিৎসার অজুহাতে তাদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রাখেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাধ্য হয়ে স্বজনরা জোরপূর্বক শিশুদের ভেতরে পাঠান। কিন্তু ভেতরে নেওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় জানানো হয় শিশুদের হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার টাকার ওষুধ কেনার ১০ মিনিটের মধ্যেই ডাক্তাররা যমজ শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন।

যমজ সন্তান হারিয়ে দিশেহারা বাবা মো. হাসান সরদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাসায় আসার কয়েক ঘণ্টা আগে এমন কী হলো যে আমার সুস্থ দুটি বাচ্চাই মারা গেল?” ডাক্তার ও নার্সদের চরম গাফিলতিকেই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রেক্ষিতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এছাড়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি আজ বৃহস্পতিবার তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। আজ বিকেল ৪টায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী স্বয়ং গণমাধ্যমের সামনে এসে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ জানাবেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘বন্ধ কলকারখানা চালু’ সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত

গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল বাচ্চাগুলো!

আপডেট সময় : ০২:৩২:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সম্প্রতি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। সেই ভয়াল রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে মুখ খুলেছেন যমজ সন্তান হারানো এক হতভাগ্য মা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং কর্তব্যরতদের অনুপস্থিতির এক লোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন তিনি। এদিকে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ার কথা রয়েছে।

ভুক্তভোগী মা নাজমা বেগম জানান, গত শনিবার বিকেলে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরদিন রোববার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যমজ পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের পর শিশুরা সম্পূর্ণ সুস্থ থাকায় পরিবারজুড়ে ছিল ঈদের আনন্দ। এমনকি বাড়ি ফিরে আকিকার দাওয়াতের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই সব আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়।

নাজমা বেগমের মারা যাওয়া যমজ সন্তান
নাজমা বেগমের মারা যাওয়া যমজ সন্তান

নাজমা বেগমের ভাষ্যমতে, বুধবার রাত ২টার দিকে একটি শিশু হঠাৎ বমি করে চিৎকার শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরেই অপর শিশুটিও অসুস্থ হয়ে পড়ে। একই সময়ে ওয়ার্ডের অন্য শিশুরাও একে একে গুরুতর অসুস্থ হতে থাকে। অভিযোগ উঠেছে, সেই সংকটময় মুহূর্তে ওয়ার্ডে কোনো ডিউটি নার্স বা ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন না। একজন আয়া দায়সারাভাবে ‘কিছু হয়নি’ বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও, কিছুক্ষণ পরই সেখানে প্রথম শিশুটি মারা যায়।

ভুক্তভোগী পরিবারটি জানায়, নবজাতকদের ওয়ার্ডের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। পুরো ওয়ার্ডে তীব্র ভ্যাপসা গরম, দুর্গন্ধ এবং ছারপোকা ও তেলাপোকার উপদ্রব ছিল আশঙ্কাজনক। এমনকি খাবারের ওপর তেলাপোকা ঝাঁক বেঁধে থাকত। বয়স্ক অভিভাবকদের কেউ কেউ ঠান্ডার ভয়ে ফ্যান বা এসি বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও দমবন্ধ হয়ে ওঠে। রাত ২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এই বৈরী পরিবেশে থেকে শিশুরা মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ে।

সকালে শিশুদের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে স্বজনরা তাদের এনআইসিইউর (NICU) সামনে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও দায়িত্বরত নার্সরা অন্য শিশুদের চিকিৎসার অজুহাতে তাদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রাখেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাধ্য হয়ে স্বজনরা জোরপূর্বক শিশুদের ভেতরে পাঠান। কিন্তু ভেতরে নেওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় জানানো হয় শিশুদের হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার টাকার ওষুধ কেনার ১০ মিনিটের মধ্যেই ডাক্তাররা যমজ শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন।

যমজ সন্তান হারিয়ে দিশেহারা বাবা মো. হাসান সরদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাসায় আসার কয়েক ঘণ্টা আগে এমন কী হলো যে আমার সুস্থ দুটি বাচ্চাই মারা গেল?” ডাক্তার ও নার্সদের চরম গাফিলতিকেই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রেক্ষিতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এছাড়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি আজ বৃহস্পতিবার তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। আজ বিকেল ৪টায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী স্বয়ং গণমাধ্যমের সামনে এসে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ জানাবেন।