ঢাকা ০৫:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম চড়া: যোগান সংকটে হতাশ জেলে ও ক্রেতারা

ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম চড়া: যোগান সংকটে হতাশ জেলে ও ক্রেতারা

বাগেরহাট: চলতি ভরা মৌসুমেও বাজারে ইলিশের দাম চড়া। ফলে চরম হতাশায় খালি হাতে ফিরছেন সাধারণ ক্রেতা ও জেলেরা। একই সাথে আড়তদার ও মহাজনরা জেলেদের দাদন দিয়ে ভারী লোকসানের মুখে পড়েছেন।

বাজারে ঘাটতি ও ইলিশের আকারে ছোট

ভরা মৌসুমের দুই মাস পার হলেও বাজারে কাক্সিক্ষত ইলিশ মিলছে না। বাজারে যে পরিমাণ ইলিশ আসছে, তার গড় আকার আগের চেয়ে বেশ ছোট। এছাড়া এসব মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ফলে এই ভরা মৌসুমেও সাধারণ মানুষের পাতে প্রিয় ইলিশ উঠছে না।

মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, নদীর নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণে উৎপাদন কমছে। পাশাপাশি প্রজনন ব্যাহত হওয়া এবং অবাধে জাটকা নিধন এর মূল কারণ। গবেষকরা জানান, আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৪৫০ গ্রাম। কিন্তু বর্তমানে তা ৩০০ গ্রামে নেমে এসেছে।

উৎপাদন হ্রাসের পরিসংখ্যান ও গবেষকদের মতামত

বর্ষাকালকেই মূলত ইলিশের প্রধান আহরণ মৌসুম ধরা হয়। দেশের মোট ইলিশের ৭০ ভাগ পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরে। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই আহরণের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে।

সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫.৩২ লাখ টন। এটি বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫.৭১ লাখ টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫.২৯ লাখ টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে মাত্র ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন ও দৈহিক আকার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও নদীদূষণ এ সংকটের প্রধান কারণ। তাই নদী ব্যবস্থার পরিবেশ রক্ষা ও সঠিক গবেষণার ওপর জোর দেন তিনি।

অবৈধ শিকার ও নদী ব্যবস্থার সংকট

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানান, একটি ইলিশ পূর্ণাঙ্গ হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ শিকারের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।

মোহনায় নিষিদ্ধ জাল, অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলন ও শিল্প-কারখানার দূষণ নদীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উপরন্তু সাগরে ট্রলিং জাহাজের কারণে মা-মাছ ও জাটকা নিধন থামছে না। কঠোর আইনের বিধান থাকলেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সিন্ডিকেট ও ফ্রিজিং ইলিশের স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাজারে ছোট আকারের ইলিশের সরবরাহও অত্যন্ত কম। অথচ বাজারে দীর্ঘদিন হিমায়িত ইলিশ চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বাজারে এক কেজি ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে ৩,৫০০ টাকা। এতে ইলিশ এখন সাধারণের নাগাল ছেড়ে রাজাদের মাছে পরিণত হয়েছে।

তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেট ও চার দফার হাতবদলকে দায়ী করছেন। পাশাপাশি জ্বালানি তেল, বরফ ও দাদনের খরচ বাড়ায় আহরণ ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে অনেক বিক্রেতা অধিক লাভের আশায় আগের বছরের মজুদ করা ‘হিম ইলিশ’ বিক্রি করছেন।

বর্তমানে বাজারে জাটকা বা ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ টাকায়। আর এক কেজি ওজনের ইলিশ ৩,৫০০ টাকা এবং দেড় কেজির ইলিশ ৪,৫০০ টাকায় বিকোচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ৬ মাসের বেশি ফ্রিজিং করা ইলিশ গুণগত মান হারায়। এর ফলে ভোক্তাদের মারাত্মক ফুড পয়জনিং হতে পারে।

মোকামে মন্দা ও সংকট উত্তরণের উপায়

ইলিশ সংকটের কারণে বিএফডিসির ২০টি অবতরণ কেন্দ্রের মধ্যে ৫টি বন্ধ হয়ে গেছে। খুলনা কেন্দ্রে চলতি জুলাইয়ে মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে, যা পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে এখানে ৩৮ হাজার কেজি ইলিশ এসেছিল।

বিশেষজ্ঞরা জানান, নিঝুম দ্বীপ ও নাফ নদীসহ ৬টি অভয়াশ্রম কার্যকরভাবে রক্ষা করা জরুরি। একই সাথে নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা ও জেলেদের উপযুক্ত প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। তবেই ইলিশের উৎপাদন পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ইস্যুতে ভারতের নজর

ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম চড়া: যোগান সংকটে হতাশ জেলে ও ক্রেতারা

আপডেট সময় : ০৫:০৩:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

বাগেরহাট: চলতি ভরা মৌসুমেও বাজারে ইলিশের দাম চড়া। ফলে চরম হতাশায় খালি হাতে ফিরছেন সাধারণ ক্রেতা ও জেলেরা। একই সাথে আড়তদার ও মহাজনরা জেলেদের দাদন দিয়ে ভারী লোকসানের মুখে পড়েছেন।

বাজারে ঘাটতি ও ইলিশের আকারে ছোট

ভরা মৌসুমের দুই মাস পার হলেও বাজারে কাক্সিক্ষত ইলিশ মিলছে না। বাজারে যে পরিমাণ ইলিশ আসছে, তার গড় আকার আগের চেয়ে বেশ ছোট। এছাড়া এসব মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ফলে এই ভরা মৌসুমেও সাধারণ মানুষের পাতে প্রিয় ইলিশ উঠছে না।

মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, নদীর নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণে উৎপাদন কমছে। পাশাপাশি প্রজনন ব্যাহত হওয়া এবং অবাধে জাটকা নিধন এর মূল কারণ। গবেষকরা জানান, আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৪৫০ গ্রাম। কিন্তু বর্তমানে তা ৩০০ গ্রামে নেমে এসেছে।

উৎপাদন হ্রাসের পরিসংখ্যান ও গবেষকদের মতামত

বর্ষাকালকেই মূলত ইলিশের প্রধান আহরণ মৌসুম ধরা হয়। দেশের মোট ইলিশের ৭০ ভাগ পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরে। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই আহরণের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে।

সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫.৩২ লাখ টন। এটি বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫.৭১ লাখ টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫.২৯ লাখ টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে মাত্র ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন ও দৈহিক আকার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও নদীদূষণ এ সংকটের প্রধান কারণ। তাই নদী ব্যবস্থার পরিবেশ রক্ষা ও সঠিক গবেষণার ওপর জোর দেন তিনি।

অবৈধ শিকার ও নদী ব্যবস্থার সংকট

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানান, একটি ইলিশ পূর্ণাঙ্গ হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ শিকারের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।

মোহনায় নিষিদ্ধ জাল, অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলন ও শিল্প-কারখানার দূষণ নদীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উপরন্তু সাগরে ট্রলিং জাহাজের কারণে মা-মাছ ও জাটকা নিধন থামছে না। কঠোর আইনের বিধান থাকলেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সিন্ডিকেট ও ফ্রিজিং ইলিশের স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাজারে ছোট আকারের ইলিশের সরবরাহও অত্যন্ত কম। অথচ বাজারে দীর্ঘদিন হিমায়িত ইলিশ চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বাজারে এক কেজি ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে ৩,৫০০ টাকা। এতে ইলিশ এখন সাধারণের নাগাল ছেড়ে রাজাদের মাছে পরিণত হয়েছে।

তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেট ও চার দফার হাতবদলকে দায়ী করছেন। পাশাপাশি জ্বালানি তেল, বরফ ও দাদনের খরচ বাড়ায় আহরণ ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে অনেক বিক্রেতা অধিক লাভের আশায় আগের বছরের মজুদ করা ‘হিম ইলিশ’ বিক্রি করছেন।

বর্তমানে বাজারে জাটকা বা ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ টাকায়। আর এক কেজি ওজনের ইলিশ ৩,৫০০ টাকা এবং দেড় কেজির ইলিশ ৪,৫০০ টাকায় বিকোচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ৬ মাসের বেশি ফ্রিজিং করা ইলিশ গুণগত মান হারায়। এর ফলে ভোক্তাদের মারাত্মক ফুড পয়জনিং হতে পারে।

মোকামে মন্দা ও সংকট উত্তরণের উপায়

ইলিশ সংকটের কারণে বিএফডিসির ২০টি অবতরণ কেন্দ্রের মধ্যে ৫টি বন্ধ হয়ে গেছে। খুলনা কেন্দ্রে চলতি জুলাইয়ে মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে, যা পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে এখানে ৩৮ হাজার কেজি ইলিশ এসেছিল।

বিশেষজ্ঞরা জানান, নিঝুম দ্বীপ ও নাফ নদীসহ ৬টি অভয়াশ্রম কার্যকরভাবে রক্ষা করা জরুরি। একই সাথে নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা ও জেলেদের উপযুক্ত প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। তবেই ইলিশের উৎপাদন পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।